নয়াদিল্লি: বয়স মাত্র ৯ বছর। স্কুলে খেলাধুলার ক্লাস শেষ করে সহপাঠীদের সঙ্গে ক্লাসরুমে ফিরেছিল তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রী। তার পর আচমকাই সব শেষ! ক্লাসে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি। দিল্লির ময়ূর বিহারের একটি বেসরকারি স্কুলের এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমেছে পরিবার ও স্কুলে। প্রাথমিক ভাবে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। যদিও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত নয়।
বুধবার সকালে ঘটনাটি ঘটে লভলি হেরিটেজ স্কুলে। পুলিশ সূত্রে খবর, তৃতীয় শ্রেণির ওই ছাত্রী খেলাধুলার ক্লাস শেষে সকাল ৯টা নাগাদ নিজের শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, ক্লাসে ঢুকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর কোমরে দু'হাত দিয়ে আচমকাই মুখ থুবড়ে মেঝেতে পড়ে যায় সে। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসেন শিক্ষিকা। শিশুটিকে তুলে বসানোর চেষ্টা করেন। মুখে জল ছিটিয়েও সাড়া না মেলায় সাহায্যের জন্য বাইরে যান তিনি। পরে স্কুলের কর্মীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
প্রথমে কাছের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও সেখানে ভর্তি নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। পরে নির্মাণ বিহারের অন্য একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে দিল্লি পুলিশের কাছে এই ঘটনার খবর পৌঁছয়। পুলিশ স্কুলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। শিশুটির পরিবারের সদস্য এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সিপিআর দেওয়া হয়েছিল কি? প্রশ্ন পরিবারের
এই ঘটনায় স্কুলের জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে শিশুটির পরিবার। পরিবারের অভিযোগ, স্কুলে পর্যাপ্ত চিকিৎসা পরিকাঠামো থাকলে এবং সময়মতো প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলে হয়তো শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হত। বিশেষ করে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত সিপিআর (কার্ডিয়োপালমোনারি রিসাসিটেশন) দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, ঘটনার পর দ্রুত শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। স্কুলের অধ্যক্ষা ভবনা মালিকের বক্তব্য, খেলাধুলার ক্লাস থেকে ফেরার পর শ্রেণিকক্ষে ঢুকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল শিশুটি। তার পরই আচমকা পড়ে যায়। স্কুলে একজন নার্সও উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।
তবে কেন সঙ্গে সঙ্গে সিপিআর দেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্নের উত্তরে অধ্যক্ষার বক্তব্য, প্রথমে শিশুটির থুতনিতে আঘাত লাগার বিষয়টি নজরে এসেছিল। কর্মীরা ভেবেছিলেন, পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার কারণেই সে অচেতন হয়ে পড়েছে। পরে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে কোনও অস্বাভাবিক ঘটনার ইঙ্গিত মেলেনি। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখার পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
শিশুদেরও কি হতে পারে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট?
এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, এত কম বয়সেও কি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হতে পারে শিশুরা? চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে আকস্মিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বিরল হলেও একেবারে অসম্ভব নয়। অনেক সময় জন্মগত হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা বা আগে থেকে অজানা কিছু শারীরিক জটিলতার কারণে এমন বিপদ দেখা দিতে পারে।
শিশুদের আকস্মিক হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ হল—
১. জন্মগত হৃদ্যন্ত্রের ত্রুটি: জন্মের সময় থেকেই হৃদ্যন্ত্রের গঠনগত কিছু সমস্যা থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শৈশবের প্রথম দিকে তা ধরা পড়ে না। পরে শারীরিক পরিশ্রমের সময় বিপদ তৈরি করতে পারে।
২. হৃদ্যন্ত্রের ছন্দের সমস্যা: অ্যারিদমিয়া বা হৃদ্স্পন্দনের অস্বাভাবিকতা শিশুদের আকস্মিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের অন্যতম কারণ। কিছু ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেতের সমস্যার কারণে হৃৎস্পন্দন বিপজ্জনক ভাবে বেড়ে বা কমে যেতে পারে।
৩. হাইপারট্রফিক কার্ডিয়োমায়োপ্যাথি: এই রোগে হৃদ্যন্ত্রের পেশি অস্বাভাবিক ভাবে মোটা হয়ে যায়। ফলে রক্ত পাম্প করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। অনেক সময় শারীরিক পরিশ্রমের সময় সমস্যা প্রকট হয়।
৪. ভাইরাস সংক্রমণ: কিছু ভাইরাস সংক্রমণের ফলে হৃদ্যন্ত্রের পেশিতে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে মায়োকার্ডাইটিস বলা হয়। এর প্রভাবে হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে।
৫. জিনগত সমস্যা: পরিবারের কারও অল্প বয়সে আকস্মিক হৃদ্রোগে মৃত্যুর ইতিহাস থাকলে শিশুদের ক্ষেত্রেও কিছু বংশগত হৃদ্রোগের ঝুঁকি থাকতে পারে।
কোন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন অভিভাবকেরা?
শিশুদের হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা সব সময় স্পষ্ট লক্ষণ নিয়ে আসে না। অনেক ক্ষেত্রে কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই বিপদ ঘটতে পারে। তবু কয়েকটি লক্ষণকে অবহেলা করা উচিত নয়।
খেলাধুলা বা দৌড়নোর সময় আচমকা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। শারীরিক পরিশ্রমের সময় বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি। অল্প পরিশ্রমেই অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট। বারবার মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার প্রবণতা।
কোনও কারণ ছাড়াই হৃদ্স্পন্দন অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া। পরিবারের কারও অল্প বয়সে আকস্মিক হৃদ্রোগে মৃত্যুর ইতিহাস। বিশেষ করে খেলাধুলার সময় কোনও শিশু অজ্ঞান হয়ে গেলে বিষয়টিকে সাধারণ দুর্বলতা বা ক্লান্তি বলে ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
স্কুলে সিপিআর প্রশিক্ষণ কতটা জরুরি?
দিল্লির এই ঘটনা স্কুলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। চিকিৎসকদের মতে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে প্রথম কয়েক মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত সিপিআর শুরু করা গেলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। প্রয়োজনে অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর (এইডি) ব্যবহারও জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।
তাই স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। পাশাপাশি স্কুলে প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মী, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছনোর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
একটি শিশুর আচমকা মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, স্কুলের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামগ্রিক প্রস্তুতি নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দেয়। দিল্লির এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, শিশুদের ক্ষেত্রেও হৃদ্যন্ত্রের বিপদকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।




