নয়াদিল্লি: দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইন নিয়ে ফের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে চলা মামলায় বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার দেওয়া মতামত বা সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের যে আবেদন জমা পড়েছে, তা এবার খতিয়ে দেখবে সুপ্রিম কোর্ট। ফলে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে আইনি বিতর্ক আরও একবার সামনে চলে এল।
মূলত, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ, তাঁদের চাকরির শর্ত এবং মেয়াদ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইনের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা হয়েছিল। গত মাসে বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। তবে বৃহত্তর সংবিধান বেঞ্চে বিষয়টি পাঠানো উচিত কি না, তা নিয়ে দুই বিচারপতির মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়।
বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর আবেদন খারিজ করে দেন। অন্যদিকে বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার মত ছিল, বিষয়টির সাংবিধানিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোই যুক্তিযুক্ত। দুই বিচারপতির ভিন্নমতের কারণে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।
এরই মধ্যে বিচারপতি শর্মার দেওয়া সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আবেদন সামনে এসেছে। সেই আবেদনই এবার পরীক্ষা করবে সুপ্রিম কোর্ট। ফলে CEC নিয়োগ আইনকে ঘিরে আইনি লড়াই নতুন মাত্রা পেল।
এই বিতর্কের সূত্রপাত ২০২৩ সালের মার্চ মাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় থেকে। ‘অনুপ বরনওয়াল বনাম ভারত সরকার’ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সংবিধান বেঞ্চ জানিয়েছিল, সংসদ নতুন আইন না আনা পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট কমিটির সুপারিশ অনুসরণ করতে হবে। সেই কমিটিতে থাকার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতির।
পরবর্তীতে কেন্দ্র সরকার সংসদে ২০২৩ সালের নতুন আইন পাশ করে। সেই আইনে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়। তাঁর পরিবর্তে একজন কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে কমিটিতে রাখার বিধান করা হয়।
নতুন এই কাঠামো নিয়েই মূল আপত্তি তুলেছে মামলাকারীরা। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস এবং কংগ্রেস নেত্রী জয়া ঠাকুর এই আইনের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁদের বক্তব্য, নতুন আইন নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আগের রায়ের মূল উদ্দেশ্যকে দুর্বল করে।
মামলার শুনানিতে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে তিন সদস্যের কমিটির গঠন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বর্তমান ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মনোনীত ক্যাবিনেট মন্ত্রী একদিকে থাকছেন, অন্যদিকে রয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দুই-এক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া আদৌ কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখন বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আবেদন সুপ্রিম কোর্ট কীভাবে বিবেচনা করে, সেদিকেই নজর রয়েছে। CEC নিয়োগ আইন নিয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার স্বাধীনতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে চলা বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
