এক সময় ২১ জুলাই মানেই ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের শক্তি প্রদর্শনের দিন। ধর্মতলার জনসমুদ্র, গ্রাম থেকে ট্রেনে-বাসে আসা লক্ষ লক্ষ কর্মী-সমর্থক, এক মঞ্চে গোটা দলের নেতৃত্ব— এই দিনটিই ছিল দলের রাজনৈতিক শক্তির বার্ষিক প্রদর্শনী। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর সেই ছবিটাই বদলে গিয়েছে। এ বার ২১ জুলাই আর এক দলের এক কর্মসূচি নয়, বরং তিনটি পৃথক রাজনৈতিক মঞ্চের প্রতীক। আর সেই পরিবর্তিত ছবিই রাজ্যের বিরোধী রাজনীতিতে তৃণমূলের বর্তমান অবস্থার সবচেয়ে বড় বার্তা।
ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূলের অন্দরে যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, তার প্রকাশ্য প্রতিফলন দেখা গেল এ বারের শহিদ দিবসে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের সমাবেশ বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে মেয়ো রোডে পৃথক শহিদ সমাবেশ। দিল্লির রাজঘাটে আবার বিদ্রোহী সাংসদদের পৃথক কর্মসূচি, যেখানে এনসিপিআই-ও যোগ দিয়েছে। একই দিনে একই রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে তিনটি আলাদা কর্মসূচি— বাংলার রাজনীতিতে এমন দৃশ্য এর আগে দেখা যায়নি। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসও সুযোগ নিতে চাইছে। শহিদ মিনারে আলাদা সমাবেশ করে তারা বিরোধী রাজনীতিতে নিজেদের নতুন করে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে।
এক সময় ২১ জুলাইয়ের মূল আকর্ষণ ছিল ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউস চত্বর। সকাল থেকেই মানুষের ঢল, যানজট, বন্ধ দোকানপাট, চায়ের দোকানে উপচে পড়া ভিড়— গোটা এলাকা যেন রাজনৈতিক মেলায় পরিণত হত। এ বার সেই ছবি কার্যত অতীত। ভিক্টোরিয়া হাউস চত্বর ছিল প্রায় স্বাভাবিক দিনের মতোই। বহু বছর পরে ব্যবসা খোলা রাখতে পেরেছেন এলাকার ছোট দোকানিরা। যাঁদের ব্যবসা এক সময় সভার জন্য বন্ধ থাকত, তাঁরাই বলছেন, সরকার বদলের পর থেকেই তাঁরা বুঝেছিলেন, এ বারের ২১ জুলাই আর আগের মতো হবে না।
তবে সংখ্যার বিচারে এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাই এগিয়ে। সকাল থেকেই বিড়লা তারামণ্ডল চত্বরে কর্মী-সমর্থকদের ভিড় চোখে পড়েছে। অন্য দিকে মেয়ো রোডে ঋতব্রত শিবিরকে মঞ্চ ভরাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। শহিদ মিনারে কংগ্রেসের সমাবেশেও ভিড় বাড়লেও তা এখনও তৃণমূলের দুই শিবিরের রাজনৈতিক লড়াইকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।
কিন্তু ভিড়ই কি এখন তৃণমূলের একমাত্র রাজনৈতিক মাপকাঠি? প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। কারণ, দলের অন্দরের বিভাজন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। যাঁরা একসময় একই মঞ্চে বসতেন, আজ তাঁরা একে অপরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন। দলের সাংসদ, বিধায়ক, জেলা নেতৃত্ব— সকলেই ছড়িয়ে পড়েছেন বিভিন্ন শিবিরে। শহিদ পরিবারগুলিও এ বার দুই ভাগে বিভক্ত। কেউ গিয়েছেন মমতার মঞ্চে, কেউ ঋতব্রত শিবিরে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য নিজের বক্তৃতায় সংগঠনের মনোবল ধরে রাখারই চেষ্টা করেছেন। সভামঞ্চ ভাঙচুর এবং সাউন্ড লাইনের তার কেটে দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিজেপিকে নিশানা করেছেন। দাবি করেছেন, আগের রাত থেকে নেতা-কর্মীদের নিয়ে তাঁকেই সভাস্থল পাহারা দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে শহিদ পরিবারগুলিকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, নানা প্রলোভন সত্ত্বেও তাঁরা দলের পাশে থেকেছেন। এই বার্তার মধ্যে স্পষ্ট ছিল কর্মীদের উদ্দেশে আবেগের আবেদন— লড়াই এখনও শেষ হয়নি।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেই সুরেই আরও এক ধাপ এগিয়ে দলত্যাগীদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি নেত্রীর কাছে আবেদন জানান, যাঁরা দল ছেড়ে গিয়েছেন, তাঁদের আর দলে না নেওয়া হোক। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মন্তব্য শুধু বিরোধীদের উদ্দেশে নয়, দলের অন্দরেও একটি স্পষ্ট বার্তা— তৃণমূল এখন নতুন করে সংগঠন গড়ার পথে হাঁটতে চাইছে।
তবে বাস্তবের চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামো অনেকটাই প্রশাসননির্ভর হয়ে উঠেছিল। ক্ষমতা হারানোর পর সেই কাঠামোর দুর্বলতা সামনে এসেছে। একাধিক প্রভাবশালী নেতা দল ছেড়েছেন। জেলা স্তরে সংগঠনের ভিত নড়ে গিয়েছে। রাজনৈতিক আনুগত্যও বদলেছে দ্রুত। ফলে শুধুমাত্র আবেগ বা অতীতের স্মৃতি দিয়ে সংগঠনকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের ২১ জুলাই শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একসময় যে দিনটি ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রতীক, আজ সেই দিনই দলীয় বিভাজনের আয়না।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই— বিরোধী আসনে বসে, ভাঙা সংগঠনকে কি আবার এক ছাতার তলায় আনতে পারবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? নাকি ২১ জুলাইয়ের এই তিনটি মঞ্চই বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূলের নতুন বাস্তবতার স্থায়ী প্রতীক হয়ে থাকবে? সেই উত্তরই আগামী দিনের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ হয়ে উঠতে চলেছে।