নিউজ ডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা সংঘাতের আবহে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ India-Middle East-Europe Economic Corridor (IMEC) নিয়ে বড় বার্তা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (GCC) ও আরব দেশগুলির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প জানান, তাঁর প্রশাসন IMEC-কে জোরালোভাবে সমর্থন করে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিকাঠামোকে ইরানের উপর নির্ভরশীল ঝুঁকিপূর্ণ পথ থেকে সরিয়ে বিকল্প রুট তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের সময়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানকে ঘিরে চলা সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণপথ এই জলপথ। ফলে সেখানে কোনও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস পরিবহণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহণ পরিকাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজকে কেন্দ্র করে হামলা ও নিরাপত্তা-ঝুঁকি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিকাঠামোকে আরও সুরক্ষিত ও বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। সেই জায়গাতেই IMEC-এর মতো বিকল্প সংযোগ ব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়ছে।
কী এই IMEC?
২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত G20 সম্মেলনের সময় IMEC-এর ঘোষণা করা হয়। প্রস্তাবিত এই করিডর ভারতকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সঙ্গে এবং সেখান থেকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা। এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রপথ, রেল যোগাযোগ এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর সমন্বিত ব্যবহার। পূর্ব করিডরটি ভারতকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে এবং উত্তর করিডরটি উপসাগরীয় অঞ্চলকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করার কথা।
এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু পণ্য পরিবহণ নয়। দ্রুততর বাণিজ্যিক যোগাযোগ, সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করা এবং ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের বিকল্প রুট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
তবে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন এখনও নানা আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলির মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে IMEC-এর অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে হয়নি বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে রাষ্ট্রসংঘে দেওয়া ভাষণে ইরান নিয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। পাল্টা ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘প্রচার’ বলে অভিহিত করেছে এবং কোনও হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালীর উপর চাপ কমাতে উপসাগরীয় দেশগুলিও বিকল্প জ্বালানি পরিবহণ ব্যবস্থা নিয়ে ভাবছে। সৌদি আরবের East-West Pipeline-এর মতো বিকল্প পরিকাঠামোও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ এর মাধ্যমে সৌদি তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের দিকে পাঠানো সম্ভব, ফলে হরমুজের উপর নির্ভরতা কমানো যায়।
সব মিলিয়ে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মধ্যে ট্রাম্পের IMEC-সমর্থন প্রকল্পটিকে আবার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তবে এটি বাস্তবে কত দ্রুত এগোয় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল হয়, তার উপরই নির্ভর করবে ভারতের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের এই বহুল আলোচিত বাণিজ্যিক করিডরের ভবিষ্যৎ।
