স্নিগ্ধা চৌধুরী
পর্দার আলো একসময় নিভে যায়। প্রোজেক্টরের শব্দ থেমে যায়। শেষ দৃশ্যে ভেসে ওঠে 'সমাপ্ত'। কিন্তু কিছু শিল্পীর ক্ষেত্রে সেই শব্দটি কোনও দিন সত্যি হয় না। তাঁরা সিনেমার শেষ ফ্রেম ভেঙে ঢুকে পড়েন মানুষের স্মৃতিতে। তারপর সময় যত এগোয়, তাঁরা ততই তরুণ হয়ে ওঠেন।
উত্তম কুমার ঠিক তেমনই এক বিস্ময়।
চল্লিশ-ছেচল্লিশ বছর আগে, ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই বাংলা সিনেমার আকাশে যেন আচমকাই সূর্যগ্রহণ নেমে এসেছিল। শুটিং চলাকালীন থেমে গিয়েছিল এক হৃদস্পন্দন, কিন্তু থামেনি এক কিংবদন্তির যাত্রা। কারণ মহানায়কদের মৃত্যু হয় না, তাঁদের কেবল মুক্তি পায় আরও একটি নতুন ছবি, যার নাম 'স্মৃতি'।
আজও কোনও বর্ষার বিকেলে টেলিভিশনে 'হারানো সুর' শুরু হলেই মনে হয়, ভালোবাসা এখনও হারিয়ে যায়নি। 'সপ্তপদী'-তে ভেসে ওঠা "এই পথ যদি না শেষ হয়…" আজ আর শুধু একটি গান নয়, বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। 'চাওয়া পাওয়া' শেখায় প্রেমের সরলতা, 'অগ্নিপরীক্ষা' মনে করিয়ে দেয় সম্পর্কের আগুনে পুড়েই ভালোবাসা খাঁটি হয়। 'ঝিন্দের বন্দী' দেখায় একজন অভিনেতা কত সহজে নিজের ছায়াকেও অভিনয়ে হার মানাতে পারেন। আর পরিচালকদের 'নায়ক' যেন প্রশ্ন তোলে,পর্দার হাসির আড়ালে একজন তারকা কতটা একা?
উত্তম কুমার শুধু অভিনয় করেননি, তিনি সংলাপকে শ্বাস দিয়েছেন, নীরবতাকে ভাষা দিয়েছেন, চোখের চাহনিকে কবিতায় পরিণত করেছেন। তাঁর ঠোঁটে উচ্চারিত প্রতিটি সংলাপ, তাঁর হাসির প্রতিটি রেখা, তাঁর বিরতির প্রতিটি মুহূর্ত, আজও অভিনয় শেখার এক অনন্ত পাঠশালা।
তাঁকে নিয়ে বলা হয়, তিনি ছিলেন মহানায়ক। কিন্তু এই অভিধাটিও যেন ছোট হয়ে যায়। কারণ তিনি কেবল একজন নায়ক নন, তিনি বাংলা সিনেমার এক অনির্বাণ প্রদীপ, যে প্রদীপের আলোয় এখনও নতুন প্রজন্ম সিনেমা দেখতে শেখে, প্রেম বুঝতে শেখে, অভিনয়ের সংজ্ঞা খুঁজে পায়।
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাই শোকের ভাষা খুঁজতে ইচ্ছে করে না। বরং মনে হয়, কোথাও যেন আবার বাজছে সেই সুর "এই পথ যদি না শেষ হয়…"। সত্যিই তো, পথ শেষ হয়নি। শেষ হয়নি মহানায়কেরও। তিনি আজও ফিরে আসেন, প্রতিটি রবিবার দুপুরে, প্রতিটি নস্টালজিয়ার সন্ধ্যায়, প্রতিটি সিনেমাপ্রেমীর হৃদয়ের গোপন প্রেক্ষাগৃহে।
কারণ কিছু মানুষ ইতিহাসে লেখা থাকেন না, ইতিহাস তাঁদের দিয়েই লেখা হয়। আর বাংলা সিনেমার সেই ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়ের নাম উত্তম কুমার।