অভিজিৎ বসু: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হঠাৎ সিপিএম নেতা বিকাশ ভট্টাচার্যের প্রতি এই দরদ কেন? তাঁর বাড়িতে কে বা কারা ঢিল ছুড়ল, তা নিয়ে এত উদ্বেগ কেন? চারদিকে যা চলছে, তাতে প্রশ্ন জাগতেই পারে বাংলার রাজনীতিতে কি নতুন কোনও সমীকরণ তৈরি হচ্ছে? একসময় যে লাল শিবিরের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান, আজ সেই শিবিরের নেতার পাশে দাঁড়ানোর বার্তা! রাজনীতির এই রংবদল সত্যিই ভাবনার বিষয়।
রাজনীতিতে শত্রু থেকে বন্ধু হয়ে ওঠার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক যাত্রার দিকে তাকালে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়। দীর্ঘদিন ধরে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে লড়াই করেই বাংলার রাজনীতিতে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি। সেই লড়াইয়ের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর আজ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলানোর পর, সিপিএম নেতা বিকাশ ভট্টাচার্যের বাড়িতে হামলার ঘটনায় তাঁর উদ্বেগ এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের দাবি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
একসময় লাল রং দেখলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক বিরোধিতার কথা মনে পড়ত। সেই লাল শিবিরের নেতার বাড়িতে যাওয়ার কথা তিনি বলছেন এ যেন বাংলার রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়। তবে এই উদ্যোগের পিছনে রাজনৈতিক সৌজন্য, গণতান্ত্রিক অবস্থান, নাকি বৃহত্তর কোনও রাজনৈতিক হিসেব কাজ করছে, তার উত্তর সময়ই দেবে।
সিঙ্গুরের সেই দিনের কথা আজও মনে পড়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভা কভার করতে গিয়েছিলাম আমি। গায়ে ছিল লাল রঙের গেঞ্জি। সেই সময় সভাস্থলে এবিপি আনন্দের ওবি ভ্যান ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। উপস্থিত ছিলেন মুকুল রায় এবং বেচারাম মান্নার মতো নেতারাও। পরিস্থিতির মধ্যে লাল গেঞ্জি পরা আমাকে সিপিএমের লোক ভেবে ভুল করা হয়েছিল। বলা হচ্ছিল, সিপিএমের লোক গাড়ি ভেঙে পালাচ্ছে! অথচ আমি সেখানে গিয়েছিলাম সাংবাদিক হিসেবে খবর সংগ্রহ করতে। পাশ থেকে মুকুল রায় আমাকে চিনিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “ও ইটিভির অভিজিৎ।”
সেই ঘটনার স্মৃতি আজও মনে পড়ে। রাজনৈতিক সংঘাতের আবহে পোশাকের রংও কখনও কখনও পরিচয়ের ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। আর সেই লাল রংই যদি একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক বিরোধিতার প্রতীক হয়ে থাকে, তাহলে আজ বিকাশ ভট্টাচার্যের পাশে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়াটা স্বাভাবিক।তবে বাংলার রাজনীতির ইতিহাস কি এত সহজে ভুলে যাওয়া যায়? সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, নেতাই, কেশপুর, নানুর এই নামগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, হিংসা এবং অসংখ্য মানুষের স্মৃতি। বাম আমলের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে হাতিয়ার করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থান। সেই অতীতের সঙ্গে বর্তমানের রাজনৈতিক অবস্থানের তুলনা টানতেই পারেন মানুষ। অতীতের সেই ঘটনাগুলি নিয়ে তাঁর বর্তমান অবস্থান কী, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিকাশ ভট্টাচার্যের বাড়িতে হামলার ঘটনায় বিজেপি বা গেরুয়া শিবিরের যোগ রয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তার সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। কোনও রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত সত্য হয়ে যায় না। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা এবং আইনের আওতায় আনা জরুরি দলমত নির্বিশেষে এই দাবির গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সারা জীবন সিপিএমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই চালিয়েছেন, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানে কি এখন নতুন কোনও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে? একসময় যাঁর রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল বামবিরোধিতা, আজ তাঁর বক্তব্যে বাম নেতার প্রতি সহমর্মিতা এই পরিবর্তনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা?
রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র বলে কিছু নেই এই কথাটি বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ক্ষমতার সমীকরণ বদলালে রাজনৈতিক সম্পর্কও বদলাতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পিছনে আদর্শগত অবস্থান কতটা, আর রাজনৈতিক বাস্তবতা কতটা সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। আজকের বাংলায় গেরুয়া শিবিরের উত্থান, তৃণমূলের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং বাম রাজনীতির নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা সব মিলিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দান ক্রমশ জটিল হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকাশ ভট্টাচার্যকে ঘিরে অবস্থান নিঃসন্দেহে আলোচনার বিষয়।
একসময় যে লাল ঝড়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার ক্ষমতায় পৌঁছেছিলেন, আজ সেই লাল শিবিরের নেতার পাশে দাঁড়ানোর বার্তা কি নিছক রাজনৈতিক সৌজন্য, নাকি বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে নতুন কোনও কৌশল? এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। রাজনীতির রং প্রতিদিন বদলায়। কখনও লাল, কখনও সবুজ, কখনও গেরুয়া। কিন্তু এই রংবদলের পিছনে মানুষের স্বার্থ কতটা, আর রাজনৈতিক সমীকরণ কতটা সেই প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কালীঘাট আর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের রাজনৈতিক দূরত্ব কি কিছুটা কমবে? নাকি এই সহমর্মিতা নির্দিষ্ট একটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? উত্তর দেবে সময়। লাল রঙে কি সত্যিই রুচি ফিরছে মমতার? নাকি বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে এই ঘটনা?
