বিষ্ণুপুর, নিউজ ডেস্ক: এককালে ছিল রাজপাঠ। ছিল এলাহী ব্যবস্থা। দুর্গা পুজোকে ঘিরে থাকতো জমকালো আয়োজন। সময় বদলেছে, বদলেছে সবকিছু। মল্ল রাজারা আর নেই, নেই রাজ্যপাঠ। তবুও ভাঙ্গাচোরা রাজবাড়ির দেওয়ালে কান পাতলে আজও যেন শোনা যায় মল্লরাজাদের প্রাচীণ ইতিহাসের পদধ্বনি। প্রাচীন রীতি ও ঐতিহ্য মেনে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর মল্লরাজাদের দুর্গোৎসবের সূচনা হয়ে গিয়েছে। এখনও মহালয়া আসেনি মাতৃ পক্ষের আগেই, সূচনা হয়ে গেল দুর্গাপুজোর। মুর্ছা পাহাড় থেকে মুহুর্মুহু গর্জে উঠল কামান। ৯ টি তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে শুরু হলো ১০৩০ বছরের মল্ল রাজ কূলদেবী মা মৃন্ময়ীর পুজো।
এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য 'পট পুজো'। শহরের শাঁখারি বাজারের ফৌজদার পরিবারের সদস্যরা ধারাবাহিকতা মেনে আজও ফি বছর বড় ঠাকুরাণী, মেজ ঠাকুরাণী ও ছোটো ঠাকুরাণীর আলাদা-আলাদা তিনটি পট আঁকেন। মন্দিরে দেবী মৃন্ময়ী প্রতিমার পাশেই নির্দিষ্ট জায়গায় এই তিনটি পট রেখে পুজো হয়।
প্রাচীণ প্রথানুযায়ী, দেবীপক্ষ পক্ষের চতুর্থীর দিন থেকে রাজপরিবারের মেজ ঠাকরুন অর্থাৎ দেবী মহালক্ষী ও সপ্তমীর দিন থেকে ছোটো ঠাকরুন অর্থাৎ দেবী মহাসরস্বতীর পুজো শুরু হয়। বড়, মেজো ও ছোটো ঠাকরুন এই তিনজনই মহামায়ার রুপ হিসেবে মল্লরাজাদের হস্ত লিখিত বলীনারায়নী পুথি অনুযায়ী পূজিতা হন।
এই রীতির আনুমানিক ১০৩০ বছরের প্রাচীন। সেই প্রাচীন রীতি মেনেই আজ মূর্ছা পাহাড় থেকে মুহুর্মুহু গর্জে উঠল কামান। বিষ্ণুপুরে শুরু হল মল্ল রাজ কূল দেবী মৃন্ময়ীর পুজো।
একসময় মল্ল রাজত্বের রাজধানী ছিল জয়পুরের প্রদ্যুম্নপুরে। ৯৯৭ খৃষ্টাব্দে মল্ল রাজ জগৎমল্ল শিকারের সন্ধানে ঘন জঙ্গলে ঘুরুতে ঘুরতে একসময় এসে হাজির হন আজকের বিষ্ণুপুরে। কথিত আছে সেখানে ক্লান্ত হয়ে রাজা একটি বট গাছের নীচে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসে পড়লে তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন অলৌকিক কান্ড কারখানা ঘটতে থাকে। জনশ্রুতি সে সময় দেবী মৃন্ময়ী প্রকট হয়ে জগৎমল্লকে বিষ্ণুপুরে মৃন্ময়ীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পুজোর নির্দেশ দেন। পাশাপাশি রাজধানী বিষ্ণুপুরে স্থানান্তরিত করে রাজত্ব শাসনের নির্দেশ দেন। কথিত আছে এরপরই মল্ল রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার পাশাপাশি রাজ প্রাসাদ লাগোয়া বিশাল মৃন্ময়ী মন্দির তৈরি করে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। কথিত আছে এরপর থেকেই মল্ল রাজারা সবদিক থেকে সমকালীন অন্যান্য রাজাদের তুলনায় এগিয়ে যেতে শুরু করে। বৈভব আর আভিজাত্যের ছোঁয়া লাগে মৃন্ময়ীর পুজোতেও। রাজার পুজো। তাই তার আচার, সংস্কার ও পুজো পদ্ধতি আলাদা। কালের নিয়মে মল্ল রাজত্ব ও রাজারা হারিয়ে গেলেও অতীতের সেই নিয়ম নিষ্ঠা আজো অটুট মৃন্ময়ীর পুজোয়।
সারা বছরের পাশাপাশি পুজোর এই দিন গুলিতে মন্দির নগরীতে বিষ্ণুপুরে পর্যটকদের ঢল নামে। প্রাচীন ঐতিহ্য আর পরম্পরার সাক্ষী থাকতে আজও জেলা, রাজ্য, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশ থেকেও বহু মানুষ ভিড় করেন। সময়ের বদল ঘটলেও বদলাইনি এই পুজোর ঐতিহ্য। একই রকম ভাবে এই পুজোর ইতিহাস অমলিন।
