নিউজ ডেস্ক: দিল্লির দীর্ঘ ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব—এই তিনটি বিষয়ই ১৯১১ সালে কলকাতা থেকে দিল্লিতে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
আজ দিল্লি মানেই ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সংসদ, রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সদর দফতর—সবই এই শহরে অবস্থিত। কিন্তু এক শতাব্দীরও বেশি আগে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল অন্যত্র।
১৯১১ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা। সেই বছর ১২ ডিসেম্বর দিল্লি দরবারে রাজা পঞ্চম জর্জ ঘোষণা করেন, ব্রিটিশ ভারতের সরকারের সদর দফতর কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই এমন একটি নতুন প্রশাসনিক শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে ‘নয়াদিল্লি’ নামে পরিচিত হয়।
কেন দিল্লি?
দিল্লিকে রাজধানী হিসেবে বেছে নেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনের আগে একাধিক রাজবংশের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল দিল্লি। বিশেষ করে মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে শহরটির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ব্রিটিশরাও দিল্লির এই ঐতিহাসিক ও সাম্রাজ্যিক পরিচয় সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন।
https://x.com/htTweets/status/2105158270927438300
১৮৭৭, ১৯০৩ এবং ১৯১১ সালে দিল্লিতে আয়োজিত হয় একাধিক রাজকীয় দরবার বা ‘দিল্লি দরবার’। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজ নিজেদের শাসনব্যবস্থাকে দিল্লির দীর্ঘদিনের সাম্রাজ্যিক ক্ষমতার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিল বলে মনে করা হয়। ১৯১১ সালের দরবার ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানেই রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছিল।
তবে শুধু ঐতিহাসিক গুরুত্বই নয়, বাস্তব প্রশাসনিক কারণও দিল্লিকে এগিয়ে রেখেছিল। কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব প্রান্তে। ফলে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল থেকে প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে কলকাতায় পৌঁছনো তুলনামূলকভাবে কঠিন ছিল। অন্যদিকে দিল্লি ছিল অপেক্ষাকৃত কেন্দ্রীয় অবস্থানে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে তার যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিল শক্তিশালী।
বিশ শতকের গোড়ায় দিল্লি একটি গুরুত্বপূর্ণ রেল ও বাণিজ্যিক সংযোগকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। রেলপথের মাধ্যমে শহরটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ব্রিটিশ ভারতের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী সিমলার সঙ্গেও দিল্লির যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক ছিল। সিমলা পর্যন্ত ট্রেনে যাতায়াতের সুযোগ থাকায় প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রেও দিল্লির গুরুত্ব বাড়ে।
বঙ্গভঙ্গ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব
ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯০৫ সালের বিতর্কিত বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত বাংলায় তীব্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। পরবর্তীকালে বঙ্গভঙ্গ বাতিল করা হলেও, এর ফলে ব্রিটিশ শাসনের ভাবমূর্তি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
কলকাতা ছিল সেই রাজনৈতিক অস্থিরতার অন্যতম কেন্দ্র। বাংলার সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। সেই পরিস্থিতিতে রাজধানী দিল্লিতে সরিয়ে নেওয়া ছিল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
১৯১১ সালের দিল্লি দরবারে রাজধানী স্থানান্তরের ঘোষণার পাশাপাশি বাংলার প্রশাসনিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়। বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষ মোকাবিলা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্তগুলি নেওয়া হয়েছিল।
কীভাবে দিল্লি হয়ে উঠল নয়াদিল্লি?
রাজধানী দিল্লিতে সরিয়ে নেওয়ার অর্থ এই ছিল না যে ব্রিটিশ প্রশাসন সরাসরি পুরনো দিল্লির ভবনগুলিতে চলে গেল। বরং পুরনো শহরের বাইরে রাইসিনা হিল এলাকায় একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়।
নতুন এই সাম্রাজ্যিক রাজধানীর নকশা তৈরি করেন ব্রিটিশ স্থপতি এডউইন লুটিয়েন্স এবং হার্বার্ট বেকার। তাঁরা প্রশস্ত রাস্তা, বিশাল সরকারি ভবন এবং পরিকল্পিত নগর কাঠামোর মাধ্যমে নতুন রাজধানীকে গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে এই এলাকাই নয়াদিল্লির প্রশাসনিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
১৯৩১ সালে নতুন রাজধানীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
অতএব, ১৯১১ সালে কলকাতা থেকে দিল্লিতে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের পিছনে ছিল একই সঙ্গে বাস্তব প্রশাসনিক এবং প্রতীকী কারণ। দিল্লির তুলনামূলক কেন্দ্রীয় অবস্থান ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা তাকে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে সুবিধাজনক করে তুলেছিল। অন্যদিকে, দীর্ঘ ইতিহাসে একাধিক সাম্রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে দিল্লির পরিচয় শহরটিকে দিয়েছিল বিশেষ রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব।
১৯১১ সালের সেই ঘোষণার এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর আজও দিল্লি ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ভৌগোলিক গুরুত্বের পাশাপাশি ক্ষমতা ও শাসনের সঙ্গে তার দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্ক শহরটির রাজনৈতিক পরিচয়কে আরও গভীর করেছে।
