ভোপাল: স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন যখন সন্তানরা ছোট। সংসারে তখন একাই অভিভাবক ছিলেন তিনি। চার সন্তান—দুই ছেলে, দুই মেয়েকে মানুষ করতে জীবনের যাবতীয় শক্তি উজাড় করে দিয়েছিলেন। ছোট ব্যবসা করে সংসার চালিয়েছেন, নিজের সামান্য বাড়িটুকুও ছিল। অথচ জীবনের শেষ চার বছর কেটেছে পরিবারের থেকে দূরে, ভোপালের একটি বৃদ্ধাশ্রমে। ৭০ বছর বয়সে যখন মৃত্যু হল, তখনও চার সন্তানের কেউ পাশে ছিলেন না। এমনকি শেষবারের মতো বাবার মুখ দেখতেও এলেন না কেউ। পরে অবশ্য তাঁর মৃত্যুর শংসাপত্র নিতে পরিবারের তরফে যোগাযোগ করা হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের ঘনশ্যামের এই কাহিনি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে বার্ধক্যে বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব নিয়েই।
ইন্দোরের বাসিন্দা ঘনশ্যাম জীবনে বড় কোনও সম্পত্তি বা বিপুল অর্থ রেখে যাননি। সাইকেলের টায়ার এবং টিউব বিক্রি করে কোনও রকমে সংসার চালাতেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর চার সন্তানকে একাই বড় করেন। ছোট মেয়েটির বয়স তখন মাত্র দু’বছর। সময়ের সঙ্গে ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছেন, নিজেদের জীবন তৈরি করেছেন। কিন্তু সেই সংসারে ঘনশ্যামের জন্য শেষ পর্যন্ত জায়গা হয়নি।
জীবনের শেষ চার বছর তাঁর ঠিকানা হয়ে ওঠে ভোপালের ‘আপনা ঘর’ বৃদ্ধাশ্রম। সেখানে তাঁকে পরিবার নিয়ে আসেনি। ভোপাল বাসস্ট্যান্ডে, অর্থাৎ আইএসবিটি এলাকায় তাঁকে একা অবস্থায় দেখতে পান কয়েক জন সমাজকর্মী। তখন তিনি আংশিক পক্ষাঘাতে আক্রান্ত, ঠিকমতো হাঁটতে পারতেন না, কথাও বলতে কষ্ট হত। সেই অবস্থায় তাঁকে নিয়ে আসা হয় বৃদ্ধাশ্রমে।
এক সময় যে মানুষটি চার সন্তানের হাত ধরে তাঁদের বড় করেছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে সেই মানুষটির হাত ধরার মতো কেউ ছিল না।
‘আপনা ঘর’-এর কর্ণধার মাধুরী মিশ্রের বক্তব্য, ঘনশ্যাম যখন সেখানে আসেন, তখন তাঁর শরীরের অর্ধেক অংশ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত ছিল। কথা বলতেও অসুবিধা হত। নিজের জীবনের কথা যতটুকু বলতে পারতেন, তাতেই জানা যায়—একটি ছোট টায়ার-টিউবের দোকান ছিল তাঁর। ইন্দোরে একটি ছোট বাড়িও ছিল।
সেই বাড়িটিও পরে বিক্রি হয়ে যায়। মাধুরীর দাবি, বাড়ি বিক্রির টাকা সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। তার পরেও বাবার সঙ্গে সম্পর্ক কার্যত ছিন্ন হয়ে যায়।
বৃদ্ধাশ্রমের পক্ষ থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও কম হয়নি। ঘনশ্যামের দেওয়া জরুরি যোগাযোগের নম্বরে ফোন করা হয়েছিল। কিন্তু সেখান থেকে যে উত্তর এসেছিল, তা আরও বেশি হতাশ করেছে আশ্রম কর্তৃপক্ষকে। মাধুরীর দাবি, ফোনে জানানো হয়েছিল—ঘনশ্যামকে তাঁরা পরিত্যাগ করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে তাঁদের আর কোনও সম্পর্ক নেই।
ঘনশ্যামের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বার বার পরিবারকে খবর দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনও বারই সন্তানরা এসে পাশে দাঁড়াননি বলে অভিযোগ আশ্রম কর্তৃপক্ষের। চার বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমই হয়ে ওঠে তাঁর পরিবার। তার পর আসে ৪ অগস্ট।
সেদিন মৃত্যু হয় ঘনশ্যামের। বয়স হয়েছিল ৭০। মৃত্যুর খবর সঙ্গে সঙ্গে পরিবারকে জানায় বৃদ্ধাশ্রম। আশা ছিল, অন্তত মৃত্যুর খবর শুনে সন্তানরা ছুটে আসবেন। হয়তো শেষবার বাবার মুখ দেখবেন, শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকবেন। কিন্তু সেই অপেক্ষাও শেষ পর্যন্ত বৃথা যায়।
দু’দিন পর্যন্ত আশ্রম কর্তৃপক্ষ অপেক্ষা করে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলতে থাকে। ইন্দোরের ঠিকানাতেও খোঁজ নেওয়া হয়। কিন্তু কেউ আসেননি। শেষ পর্যন্ত পুলিশের সাহায্যে ঘনশ্যামের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে হয়।
মৃত্যুর পরও অবশ্য গল্প থামেনি। বরং সেখানেই তৈরি হয়েছে আরও এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন। ঘনশ্যামের পরিবারের তরফে এখন তাঁর মৃত্যুর শংসাপত্র চাওয়া হয়েছে। মাধুরী মিশ্র জানিয়েছেন, তাঁরা আপাতত সেই শংসাপত্র দিতে চান না। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘জীবিত অবস্থায় যাঁর কাছে কেউ এলেন না, মৃত্যুর পরও যাঁর শেষকৃত্যে কেউ এলেন না, এখন তাঁর মৃত্যুর শংসাপত্রের প্রয়োজন কেন?’’
ঘনশ্যামের সন্তানদের বক্তব্যে উঠে এসেছে সম্পত্তি ঘিরে টানাপড়েনের কথা। মাধুরীর দাবি, তাঁর এক মেয়ের অভিযোগ ছিল, বাবার সম্পত্তি ছেলেদের দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তিনি কিছু পাননি। সেই কারণেই তিনি বাবার কাছে যেতে চাননি বলে আশ্রম কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। অন্য দিকে ছেলেদের তরফে বাবার জন্য কী করেছেন, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছিল বলে দাবি মাধুরীর।
এক জন বাবা চার সন্তানকে মানুষ করেছিলেন। আর চার সন্তান মিলে সেই বাবার শেষ দিনগুলিতে তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারলেন না, মধ্যপ্রদেশের এই ঘটনা তাই নিছক একটি বৃদ্ধাশ্রমের গল্প হয়ে থাকছে না। প্রশ্ন উঠছে বদলে যাওয়া পারিবারিক সম্পর্ক নিয়েও।
মাধুরী মিশ্রের কথাতেই যেন পুরো ঘটনার সবচেয়ে কঠিন জায়গাটি ধরা পড়ে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা—এক সময় একজন বাবা চার-পাঁচটি সন্তানকে মানুষ করতেন। অথচ আজ চার সন্তান মিলে একজন বাবার দেখভাল করতে পারলেন না।
ঘনশ্যামের জীবন শেষ হয়েছে ভোপালের বৃদ্ধাশ্রমে। শেষযাত্রায় ছিলেন না তাঁর চার সন্তান। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরে একটি কাগজের প্রয়োজন হয়েছে পরিবারের। সেই কাগজটির নাম, মৃত্যুর শংসাপত্র। আর সেই ঘটনাই যেন নতুন করে প্রশ্ন করছে, বাবা যখন বেঁচে ছিলেন, তখন তাঁর প্রয়োজন ছিল না; মৃত্যুর পর তাঁর কাগজের প্রয়োজন হল কেন?