বিশেষ প্রতিবেদন: মহাত্মা গান্ধীর জীবনযাত্রার কথা উঠলেই তাঁর সরল পোশাক, চরকা, উপবাস এবং নিরামিষ খাবারের কথা মনে আসে। কিন্তু তাঁর খাদ্যাভ্যাসের গল্পটি আসলে আরও বৈচিত্র্যময়। গান্ধীজি ছোটবেলা থেকেই নিরামিষ খাবারের পরিবেশে বড় হলেও, খাবার নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা একেবারে স্থির ছিল না। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজের শরীর, বিশ্বাস ও আত্মসংযমকে সামনে রেখে নানা ধরনের খাদ্যাভ্যাস পরীক্ষা করেছেন। ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টারি পড়ার সময় নিরামিষভোজন নিয়ে তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়। তিনি Vegetarian Society-র সঙ্গে যুক্ত হন এবং নিরামিষ খাবারের পুষ্টিগুণ ও নৈতিক দিক নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে এই বিষয়টি তাঁর কাছে শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাস নয়, আত্মসংযম ও জীবনদর্শনেরও অংশ হয়ে ওঠে।
চা-কফির প্রসঙ্গে প্রচলিত একটি ধারণা হল, গান্ধীজি নাকি জীবনে কখনও চা বা কফি স্পর্শই করেননি। কিন্তু তাঁর নিজের আত্মজীবনী পড়লে বিষয়টি এতটা সরল নয়। জীবনের একটি পর্যায়ে তিনি চা ও কফি পান করতেন। পরে স্বাস্থ্য ও খাদ্যসংযম নিয়ে নিজের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় তিনি এগুলো বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর লেখায় পাওয়া যায়, সেই সময় চা ও কফির পরিবর্তে তিনি কোকো পান করার অভ্যাস করেছিলেন। অর্থাৎ, ‘গান্ধীজি কখনও চা-কফি খাননি’ বলা ঐতিহাসিকভাবে অতিরঞ্জিত; বরং বলা যায়, পরবর্তী জীবনে তিনি নিজের খাদ্যসংযমের অংশ হিসেবে চা ও কফি এড়িয়ে চলতেন।
তবে গান্ধীর খাদ্যাভ্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল তাঁর পরীক্ষা করার প্রবণতা। তিনি কোনও একটি খাদ্যকে সারাজীবনের জন্য ভালো বা খারাপ বলে ধরে নিয়ে থেমে থাকতেন না। নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিভিন্ন খাবার নিয়ে পরীক্ষা করতেন। কখনও খাবারের পরিমাণ কমিয়েছেন, কখনও মশলা ও মিষ্টি বাদ দিয়েছেন, আবার কখনও ফল, রুটি বা অন্যান্য সরল খাবারকে খাদ্যের প্রধান অংশ করেছেন। দুধ নিয়েও তাঁর অবস্থান জীবনের বিভিন্ন সময়ে বদলেছে। এক পর্যায়ে তিনি দুধ বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন; পরে চিকিৎসাগত প্রয়োজন ও নিজের শারীরিক অবস্থার কারণে আবার দুধ গ্রহণ শুরু করেন। এই পরিবর্তনগুলো থেকেই বোঝা যায়, তাঁর খাদ্যদর্শন ছিল কোনও কঠোর, অপরিবর্তনীয় তালিকা নয়।
নিরামিষভোজন অবশ্য তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যনৈতিক অবস্থান হয়ে উঠেছিল। ইংল্যান্ডে থাকার সময় তিনি নিরামিষভোজন নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করেন এবং ধীরে ধীরে এর প্রতি তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। তাঁর কাছে খাবারের বিষয়টি শুধু শরীরের পুষ্টির সঙ্গে যুক্ত ছিল না; প্রাণীর প্রতি আচরণ, আত্মসংযম এবং মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ভোগের প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত ছিল। এই কারণেই তাঁর খাদ্যাভ্যাসে সরলতা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি খাবারকে উপভোগের বস্তু হিসেবে দেখার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করার দিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
গান্ধীজির খাবারের তালিকায় তাই বিলাসী বা জটিল রান্নার চেয়ে সাধারণ খাবারের উপস্থিতিই বেশি দেখা যায়। ফল, শাকসবজি, শস্যজাত খাবার, বাদাম এবং বিভিন্ন ধরনের সরল নিরামিষ খাবার তাঁর খাদ্যাভ্যাসে জায়গা পেয়েছে। তবে তাঁর জীবনের সব সময় একই খাবারের তালিকা ছিল না। বয়স, স্বাস্থ্য, আশ্রমের পরিস্থিতি এবং নিজের চলমান খাদ্য-পরীক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাবারের ধরনও বদলেছে। তাঁর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এই বিষয়টি মনে রাখা জরুরি, কারণ পরবর্তী সময়ে তাঁর সম্পর্কে তৈরি হওয়া অনেক জনপ্রিয় গল্পে তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের খাবারকে একসঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।
খাবারের পরিমাণ নিয়েও গান্ধী ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। তাঁর কাছে স্বাদ ও ক্ষুধার মধ্যে পার্থক্য বোঝা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মানুষ অনেক সময় শরীরের প্রয়োজনের জন্য নয়, শুধু জিভের স্বাদের জন্য বেশি খায়, এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা তিনি নিজে করেছিলেন। তাঁর কাছে কম খাওয়া মানে শুধু শরীরকে হালকা রাখা নয়; নিজের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করারও একটি অনুশীলন। এই কারণেই উপবাস তাঁর জীবনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। তবে তাঁর উপবাসকে শুধু খাদ্যসংযম হিসেবে দেখলে ভুল হবে, রাজনৈতিক প্রতিবাদ, আত্মশুদ্ধি এবং নৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রেও তিনি উপবাসকে ব্যবহার করেছেন।
আর একটি তথ্য গান্ধীর খাদ্যাভ্যাসকে আরও মানবিক করে তোলে। তিনি নিজের জন্য যে খাদ্যনিয়ম অনুসরণ করতেন, তা আশেপাশের প্রত্যেক মানুষের উপর একইভাবে চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। তাঁর চিঠিপত্রে এমন উদাহরণ পাওয়া যায় যেখানে তিনি স্বীকার করেছেন যে অন্য মানুষের খাদ্যাভ্যাস তাঁর নিজের থেকে আলাদা হতে পারে। চা-কফির প্রসঙ্গেও এমন উল্লেখ পাওয়া যায়। এমনকি কস্তুরবা গান্ধীর চা বা কফি পান করার কথাও তাঁর লেখায় এসেছে। অর্থাৎ, নিজের খাদ্যসংযমকে তিনি ব্যক্তিগত সাধনা হিসেবে দেখতেন; সেটিকে প্রত্যেকের জন্য বাধ্যতামূলক জীবনযাপনের নিয়ম বানানো তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।
সব মিলিয়ে গান্ধীজির খাবারের গল্প কোনও নির্দিষ্ট ‘ডায়েট চার্ট’-এর গল্প নয়। এটি একজন মানুষের নিজের শরীর, ইচ্ছা, বিশ্বাস এবং জীবনযাপনকে বোঝার দীর্ঘ প্রচেষ্টার গল্প। তিনি কখনও চা-কফি পান করেছেন, পরে সেগুলো বর্জন করেছেন; নিরামিষভোজনকে নিজের জীবনদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছেন; বিভিন্ন খাবার নিয়ে পরীক্ষা করেছেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের সিদ্ধান্ত বদলেছেন। তাঁর খাদ্যাভ্যাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় তাই তিনি ঠিক কী খেতেন, তার চেয়েও বেশি তিনি কেন কী খাচ্ছেন, সেই প্রশ্নটি নিজেকেই বারবার করতেন। আর সেই কারণেই তাঁর খাবারের অভ্যাসও তাঁর বৃহত্তর ‘সত্যের সঙ্গে পরীক্ষা’-র একটি অংশ হয়ে উঠেছিল।
