কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: একটা ঠান্ডা রাত। নির্জন রেলস্টেশন। হাতে প্রথম শ্রেণির বৈধ টিকিট। অথচ সেই টিকিটও তাঁকে রক্ষা করতে পারেনি।
আজ যে মানুষটিকে গোটা বিশ্ব মহাত্মা গান্ধী নামে চেনে, তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের শুরু হয়েছিল এমনই এক অপমানজনক রাত দিয়ে।
সময়টা ১৮৯৩ সাল। বয়স মাত্র ২৪। তখনও তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা নন, তাঁর নামের সঙ্গে ‘মহাত্মা’ শব্দটিও জুড়ে যায়নি। তিনি ছিলেন তরুণ এক ভারতীয় ব্যারিস্টার। পেশাগত কাজে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।
সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় ও অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যাপক বৈষম্য ছিল। গান্ধীও খুব দ্রুত সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হন।
একদিন তিনি ট্রেনে চড়েছিলেন। তাঁর কাছে ছিল প্রথম শ্রেণির বৈধ টিকিট। সেই টিকিটের অধিকারেই তিনি প্রথম শ্রেণির কামরায় বসেছিলেন।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর এক শ্বেতাঙ্গ যাত্রী আপত্তি জানান, একজন ভারতীয় কীভাবে প্রথম শ্রেণির কামরায় বসে থাকতে পারেন?
গান্ধী তাঁর টিকিট দেখান। তিনি জানান, তাঁর কাছে প্রথম শ্রেণির বৈধ টিকিট রয়েছে। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি বদলায়নি।
শেষ পর্যন্ত তাঁকে কামরা থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং পিটারম্যারিট্জবার্গ স্টেশনে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়।
ভাবুন সেই মুহূর্তটা।
একজন তরুণ ব্যারিস্টার। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। হাতে বৈধ টিকিট। তবুও শুধুমাত্র তাঁর পরিচয়ের কারণে তাঁকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হল।
রাতের ঠান্ডায় স্টেশনে বসে থাকতে হয়েছিল তাঁকে।
পরবর্তীকালে গান্ধীর নিজের বর্ণনায়, সেই রাতটি তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, অন্যায়ের সামনে নীরব হয়ে ফিরে যাবেন না।
কিন্তু এখানেই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই একটি ঘটনাকেই গান্ধীর পুরো রাজনৈতিক দর্শনের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অতিরঞ্জিত হয়ে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর পরবর্তী দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ভারতীয়দের অধিকার নিয়ে কাজ এবং একাধিক বৈষম্যের মুখোমুখি হওয়া সব মিলিয়েই তাঁর চিন্তাধারার বিকাশ ঘটে।
দক্ষিণ আফ্রিকাতেই তিনি ধীরে ধীরে এমন এক আন্দোলনের পদ্ধতি গড়ে তুলতে শুরু করেন, যা পরে পরিচিত হয় ‘সত্যাগ্রহ’ নামে।
প্রায় দুই দশক দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকার পর ১৯১৫ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন।
এরপরের ইতিহাস আমরা কমবেশি সবাই জানি।
চম্পারণ, খেদা, অসহযোগ আন্দোলন, লবণ সত্যাগ্রহ একসময় গান্ধী হয়ে ওঠেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান নেতা।
কিন্তু ইতিহাসের বিশাল সেই অধ্যায়ের দিকে তাকালে মাঝে মাঝে ফিরে যেতে হয় সেই ছোট্ট রেলস্টেশনের রাতটিতে।
কারণ সেখানেই দেখা যায় গান্ধীর জীবনের এক অন্য ছবি।
তখন তিনি ‘মহাত্মা’ নন।
তিনি ইতিহাসের মহানায়ক নন।
তিনি শুধু ২৪ বছরের এক তরুণ ব্যারিস্টার, যিনি নিজের চোখে বৈষম্য দেখেছিলেন এবং সেই অভিজ্ঞতার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন।
একটি ট্রেনের কামরা, একটি বৈধ টিকিট, একটি শীতল রাত আর সেই রাতের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে প্রভাব ফেলল এমন এক যাত্রায়, যা তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম পরিচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করল।
এই কারণেই পিটারম্যারিট্জবার্গের সেই রাত আজও গান্ধীর জীবনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হিসেবে স্মরণ করা হয়।
