বিশেষ প্রতিবেদন: মহাত্মা গান্ধী নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গোল চশমা, হাতে লাঠি, পরনে সাদা ধুতি আর স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলির ছবি। তাঁর নেতৃত্ব, সত্যাগ্রহ, অহিংসা এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কথা ইতিহাসের পাতায় বারবার ফিরে আসে। কিন্তু এই পরিচিত ছবির আড়ালেও ছিলেন আরও এক গান্ধী একজন গভীর চিন্তাশীল পাঠক, লেখক এবং অনুবাদক।
আর সেই গান্ধীকে চিনতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় একটি প্রাচীন গ্রন্থের দিকে,ভগবদ্গীতা।
অনেকেই হয়তো জানেন না, গান্ধীজি গীতাকে শুধু পড়তেন না, তাঁর চিন্তা ও জীবনদর্শনের সঙ্গে গীতার শিক্ষার গভীর সম্পর্ক ছিল। তিনি ভগবদ্গীতাকে গুজরাটি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর সেই অনুবাদের নাম ‘অনাসক্তিযোগ’।
নামটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘অনাসক্তি’ অর্থ কাজ করা, কিন্তু কাজের ফলের প্রতি মোহ বা অতিরিক্ত আসক্তিতে আবদ্ধ না হওয়া। গীতার কর্মযোগের এই ধারণা গান্ধীজির চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।
গান্ধীজির কাছে গীতা শুধুমাত্র ধর্মীয় গ্রন্থ ছিল না। তিনি গীতার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন মানুষের জীবনযাপনের একটি নৈতিক দর্শন। কীভাবে নিজের কর্তব্য পালন করতে হয়, কীভাবে কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজের আদর্শে অটল থাকা যায়, কীভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করা যায় এসব প্রশ্নের উত্তর তিনি গীতার শিক্ষার মধ্যে খুঁজতেন।
এই কারণেই তাঁর গীতা-অনুবাদ নিছক ভাষান্তরের কাজ ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন, গীতার ভাবনা সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছাক। সংস্কৃত ভাষার জটিল শ্লোকের অর্থকে নিজের মাতৃভাষা গুজরাটিতে তুলে ধরে তিনি গীতার দর্শনকে আরও বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
গান্ধী হেরিটেজ পোর্টালের নথিতে ‘Anasaktiyoga’-কে গান্ধীজির গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলির একটি হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেখানে এটিকে গীতার তাঁর গুজরাটি অনুবাদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বইটির প্রকাশনার সঙ্গে Navajivan Publishing House-এর নামও যুক্ত।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল গান্ধীজির রাজনৈতিক দর্শন এবং তাঁর গীতা-পাঠকে একেবারে আলাদা করে দেখা কঠিন। সত্য, আত্মসংযম, কর্তব্য এবং ফলের প্রতি অনাসক্তির মতো ধারণাগুলি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও জনজীবনের চিন্তাভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়েছিল।
অর্থাৎ, যাঁকে আমরা ইতিহাসের পাতায় একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখি, তাঁর ভিতরে একইসঙ্গে কাজ করছিলেন একজন পাঠক ও চিন্তক। হাতে ছিল রাজনৈতিক সংগ্রামের দায়িত্ব, আর মনের ভিতরে চলছিল নৈতিকতা, কর্তব্য ও আত্মসংযম নিয়ে গভীর চিন্তা।
গান্ধীজির জীবনের এই অধ্যায়টি তাই অন্যরকম। কারণ এখানে কোনও রাজনৈতিক মিছিল নেই, নেই ব্রিটিশবিরোধী স্লোগানও। আছে একজন মানুষের সঙ্গে একটি প্রাচীন দর্শনের দীর্ঘ কথোপকথন।
আর সেই কথোপকথনকে নিজের ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নাম, ‘অনাসক্তিযোগ’।
তাই গান্ধীজিকে শুধু চরকা, লাঠি, সত্যাগ্রহ কিংবা স্বাধীনতা সংগ্রামের ছবিতে আটকে রাখলে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অদেখাই থেকে যায়।
স্বাধীনতার ইতিহাসের সেই পরিচিত গান্ধীর পাশেই ছিলেন আরেক গান্ধী, যিনি গীতাকে পড়েছিলেন, তার দর্শন নিয়ে ভেবেছিলেন, এবং শেষ পর্যন্ত সেই গীতাকেই নিজের মাতৃভাষায় অনুবাদ করেছিলেন।
এই কারণেই ‘অনাসক্তিযোগ’-এর গল্প শুধু একটি বইয়ের গল্প নয়, এটি গান্ধীজির চিন্তার জগতকে নতুন করে দেখার একটি দরজা।
