নিউজ ডেস্ক: কলকাতার শারদোৎসব মানেই বনেদিয়ানার পাশাপাশি থিম পুজোর ভিড়, আলোর ঝলকানি আর আড়ম্বরপূর্ণ রাজপথ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বহু অঞ্চলে দুর্গাৎসব এই চকমকে আধুনিকতার থেকে বহু দূরে। রাঢ় বাংলার নিভৃতে প্রকৃতির কোলে এখনও মাথা উঁচু করে স্বগৌরবে বিরাজমান এমন কিছু স্থান, যা আমাদের হাজার বছরের পুরনো ইতিহাসের পাতায় পৌঁছে দেয়। পুরুলিয়া জেলার আড়শা ব্লকের অন্তর্গত কংসাবতী নদীর তীরে অবস্থিত জঙ্গলের মাঝে দেউলঘাটা এমনই এক প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিস্ময়। এখানকার সুপ্রাচীন পোড়ামাটির মন্দির এবং দেবীর মূর্তিকে নিয়ে রয়েছে বহু শতাব্দীর রহস্য ও লোকগাথা।
বৌদ্ধ ও জৈন স্থাপত্যের আঙ্গিকে তৈরি এখানকার মন্দিরগুলি। মন্দিরের প্রবেশদ্বারগুলি ত্রিভুজাকৃতি বা কর্বেটেড আর্চের হয়ে থাকে। মন্দিরগাত্রের অলংকরণের কারুকার্য অনেকটা বিহারের প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারগুলির সঙ্গে মেলে। দেউলঘাটার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখানকার কষ্টিপাথরে খোদিত প্রাচীন দুর্গা বা মহিষাসুরমর্দিনী, যা আমাদের প্রচলিত চেনা প্রতিমার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মূর্তির গঠনশৈলীতে প্রাচীন শিল্পরীতির অপূর্ব মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়।
এখানকার দেবী কৃষ্ণবর্ণ। দেবীর মূর্তির মাথার উপরে রয়েছে একটি বিশেষ চক্র স্তম্ভ, পায়ের তলায় এবং চালচিত্রের গায়ে অবিকল উড়ন্ত গন্ধর্ব বা পরীদের মূর্তি খোদাই করা, দু’পাশে অষ্টমাতৃকা রূপের উপস্থিতি। দেবীর ডান পা মহিষের উপর এবং বাঁ পা সিংহের উপর রয়েছে যা চিরাচরিত মূর্তির ঠিক বিপরীত। দেউলঘাটার এই প্রতিমায় দেবী সপরিবারে নেই অর্থাৎ লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ কাউকেই দেখা যায় না।
ঐতিহাসিকদের মতে, দেউলঘাটার এই অঞ্চলটি মূলত প্রাচীনকালে জৈন ও পরবর্তীকালে শাক্ত সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল। শোনা যায়, বহু বছর ধরে এই মাতৃমূর্তিটি একটি গাছের তলায় উন্মুক্ত আকাশের নিচে পূজিত হতো। মূল মন্দির পরবর্তীকালে তৈরি করা হয়েছে। মহালয়ার দিন থেকেই এই প্রাচীন মন্দিরে পবিত্র চণ্ডীপাঠ শুরু হয়ে যায়। আলোর রোশনাই না থাকলেও এখানকার আদিমতার মধ্যে মায়ের স্নিগ্ধতা, আভিজাত্য এবং সবুজে ঘেরা শান্ত পরিবেশ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে গবেষক, পর্যটক এবং সাধারণ মানুষ ভিড় জমান। এমনকি ভিনদেশ থেকেও বহু মানুষ এই প্রাচীন ইতিহাসের টানে আসেন।
বহু মূল্যবান এই প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ আজ চরম অবহেলায় ধুঁকছে। ২০০২ সালে সংস্কারের কাজের সময় একটি বিশাল পোড়ামাটির মন্দির প্রবল বর্ষায় ধসে পড়ে। কংসাবতীর ভাঙন, চারিদিকে জঙ্গল এবং প্রশাসনিক উদাসীনতায় এই ঐতিহাসিক নিদর্শন আজ বিলুপ্তির পথে। দেউলঘাটার এই প্রাচীন ঐতিহ্য শুধুমাত্র একটি পুজোর স্থান নয়, এটি রাঢ় বাংলার ধর্মীয় বিবর্তন ও ভাস্কর্য শিল্পের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দলিল।
