কলকাতা: বন্ধুত্বের কোনও জন্মসনদ নেই। নেই রক্তের সম্পর্ক, সামাজিক বাধ্যবাধকতা বা আইনি স্বীকৃতি। তবু জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে যে মানুষটির কথা প্রথম মনে পড়ে, তিনি অনেক সময় পরিবারের কেউ নন— একজন বন্ধু।
এই সম্পর্কের সৌন্দর্যই অন্য রকম। এখানে হিসেব নেই, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খাতা নেই। আছে শুধু একে অপরের পাশে থাকার অলিখিত প্রতিশ্রুতি। তাই অগস্টের প্রথম রবিবার এলেই পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ একটু থেমে যায়। পুরনো অ্যালবামের ধুলো ঝাড়ে, ফোনের কনট্যাক্ট লিস্টে স্ক্রল করে, বহু দিন কথা না হওয়া কাউকে একটি বার্তা পাঠায়— “কেমন আছিস?”
ভারতে বহু বছর ধরেই অগস্টের প্রথম রবিবার বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এ বছর সেই দিনটি ২ অগস্ট। যদিও রাষ্ট্রপুঞ্জ ৩০ জুলাইকে ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে অব ফ্রেন্ডশিপ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, ভারতীয়দের কাছে প্রথম রবিবারের আবেগ এখনও অটুট।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে উদ্যাপন, বদলায়নি আবেগ
নব্বইয়ের দশক বা দুই হাজারের শুরুর কথা মনে আছে? স্কুলের গেটের সামনে রঙিন ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ডের দোকান, পকেটমানি জমিয়ে বন্ধুদের জন্য ব্যান্ড কেনা, ক্লাসে ঢোকার আগেই হাতে হাতে রঙিন সুতো বাঁধার উৎসব। কে ক'টি ব্যান্ড পেল, তা নিয়ে চলত মিষ্টি প্রতিযোগিতা।
মোবাইল ফোন তখনও সবার হাতে পৌঁছয়নি। ফলে বন্ধুত্ব প্রকাশের ভাষাও ছিল অন্য রকম। হাতে লেখা ছোট্ট চিঠি, শুভেচ্ছা কার্ড, ডায়েরির পাতায় কয়েকটি লাইন কিংবা বিকেলের আড্ডা— এগুলিই ছিল অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম।
আজ ছবিটা বদলে গিয়েছে। স্মার্টফোনের স্ক্রিনেই সীমাবদ্ধ অনেক সম্পর্ক। শুভেচ্ছা পৌঁছে যায় কয়েক সেকেন্ডে। ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে পুরনো ছবি, হোয়াটসঅ্যাপে লম্বা মেসেজ, ফেসবুকে স্মৃতির কোলাজ— ডিজিটাল দুনিয়াই এখন বন্ধুত্ব উদ্যাপনের নতুন ঠিকানা।
কিন্তু প্রযুক্তি কি সত্যিই দূরত্ব কমিয়েছে? নাকি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম বদলেছে?
অনলাইন সংযোগ, অফলাইন শূন্যতা
সোশ্যাল মিডিয়ায় শত শত ‘ফ্রেন্ড’। হাজার হাজার ‘ফলোয়ার’। তবু অনেকেই একাকী। মনোবিদদের মতে, ডিজিটাল যোগাযোগ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু গভীর কথোপকথন কমেছে। ‘Seen’ হয়ে থাকা মেসেজের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ আড্ডা, মন খুলে কথা বলা কিংবা বিনা প্রয়োজনে কারও দরজায় কড়া নাড়া।
বন্ধুত্ব দিবস তাই শুধু শুভেচ্ছা বিনিময়ের দিন নয়। এটি সম্পর্কের আয়নায় নিজের মুখ দেখারও দিন। শেষ কবে কোনও বন্ধুকে শুধু তার খবর নিতে ফোন করেছেন? শেষ কবে কোনও প্রত্যাশা ছাড়াই বলেছিলেন— "চল, দেখা করি"?
বন্ধু মানে যে শুধু আনন্দের সঙ্গী নয়
জীবনের সাফল্যের মুহূর্তে পাশে অনেকেই থাকেন। কিন্তু ব্যর্থতার অন্ধকারে যিনি নীরবে কাঁধে হাত রাখেন, তিনিই প্রকৃত বন্ধু। পরীক্ষায় খারাপ ফল, চাকরি হারানো, প্রেম ভাঙা, পরিবারের সংকট— এমন অসংখ্য সময়ে বন্ধুরাই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বড় মানসিক শক্তি।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সুস্থ বন্ধুত্ব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাস, সহমর্মিতা এবং নিঃস্বার্থ সমর্থন একজন মানুষকে চাপ সামলাতে সাহায্য করে। তাই বন্ধুত্ব কেবল আবেগ নয়, সুস্থ জীবনেরও এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
একটি বার্তার মূল্য কত?
এই বন্ধুত্ব দিবসে হয়তো দামি উপহার কেনার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই বাহুল্য আয়োজনেরও। বরং বহু দিন যোগাযোগ নেই, এমন কোনও বন্ধুকে একটি বার্তা পাঠান।
হয়তো লিখবেন— “হঠাৎ তোর কথা মনে পড়ল। কেমন আছিস?”
বিশ্বাস করুন, সেই কয়েকটি শব্দ হয়তো এমন একটি সম্পর্ককে আবার বাঁচিয়ে তুলবে, যা ব্যস্ততার ধুলোয় চাপা পড়ে গিয়েছিল।
কারণ সত্যিকারের বন্ধুত্ব সময়ের সঙ্গে পুরনো হয় না। দূরত্ব তাকে শেষ করতে পারে না। জীবন যতই পাল্টাক, কিছু মানুষ থেকে যান মনের এমন এক কোণে, যেখানে অভিমান থাকে, নীরবতা থাকে, কিন্তু বিচ্ছেদ থাকে না।
বন্ধুত্ব দিবস সেই মানুষগুলোর প্রতিই এক নিঃশব্দ কৃতজ্ঞতা। যাঁরা প্রমাণ করেন— জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ সব সময় টাকায় মাপা যায় না; কখনও কখনও তার নাম হয়, বন্ধু।