কলকাতা: রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু নেই, শত্রুও নেই ! এই বহুলচর্চিত প্রবাদ বাংলার রাজনীতিতে বহুবার সত্যি হয়েছে। কিন্তু মাত্র দু'মাসের মধ্যে এত দ্রুত শত্রুতা গলে গিয়ে সহাবস্থানের ছবি খুব কমই দেখা গিয়েছে।
যে অনুব্রত মণ্ডল আর কাজল শেখকে এক মঞ্চে বসানোই এক সময় ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষাগুলির একটি, আজ তাঁরাই একই শিবিরে। শুধু তাই নয়, সূত্রের খবর, বীরভূমের জেলা সভাপতির দায়িত্বও পেতে চলেছেন অনুব্রত। অর্থাৎ, যে জেলার দখল নিয়ে বছরের পর বছর রক্তচাপ বেড়েছে দুই নেতার, সেই জেলাই আবার কেষ্টর হাতে ফিরতে পারে। রাজনীতির ভাষায় একে কি 'পুনর্মিলন' বলা যাবে? নাকি 'প্রয়োজনের সন্ধি'?
বীরভূমের রাজনীতি জানে, অনুব্রত-কাজলের সংঘাত কোনও ব্যক্তিগত মনোমালিন্য ছিল না। সেটা ছিল ক্ষমতার সংঘর্ষ। অনুব্রত জেলে যাওয়ার পর জেলার সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় কাজলের হাতে। জেল থেকে ফিরে সেই জমি আর ফিরে পাননি কেষ্ট। কোর কমিটি গড়েও পরিস্থিতি সামলাতে পারেননি মমতা। দলনেত্রীর সামনেই প্রকাশ্যে বাদানুবাদ করেছেন দু'জন। আজ সেই দুই নেতাই একই ছাতার তলায়। এখানেই শেষ নয়।
কোহিনূর মজুমদার, সুদীপ রাহা, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য— তালিকাটা যত লম্বা হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে আর একটি ছবি। যাঁরা কয়েক মাস আগেও একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাঁরাই এখন পাশাপাশি বসে বৈঠক করছেন। রাজনীতিতে এমন বদল অবশ্য হঠাৎ হয় না। তার পিছনে থাকে বড় কোনও অভিঘাত।
৪ মে-র ক্ষমতার পালাবদল সেই অভিঘাত। তৃণমূলের এক প্রবীণ নেতার কথায়, "ক্ষমতা থাকলে মতাদর্শের কথা বলা সহজ। ক্ষমতা চলে গেলে প্রথম চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় মামলা, সম্পত্তি আর ভবিষ্যৎ।" এই মন্তব্যকে নিছক রাজনৈতিক কটাক্ষ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। কারণ, নতুন শিবিরে যাওয়া নেতাদের বড় অংশের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার মামলা রয়েছে।
অনুব্রত মণ্ডলের ঘটনাই ধরা যাক। ২০১৩ সালে পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা মারার মন্তব্য করেছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন হেসে বলেছিলেন, "ওর মাথায় অক্সিজেন কম যায়।" পরে বোলপুর থানার আইসিকে ফোনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের অভিযোগ ওঠে। তখনও দল তাঁর পাশে ছিল। গরুপাচার মামলায় মেয়ে সুকন্যা মণ্ডল গ্রেফতার হলে তৃণমূলের মুখপাত্ররাই প্রশ্ন তুলেছিলেন, গ্রেফতার না করেও কি তদন্ত চলতে পারত না?
সেই অনুব্রতই আজ অন্য শিবিরে। কেন? দলের একাংশের ব্যাখ্যা, এর কেন্দ্রে রয়েছে পরিবার। অন্য অংশ বলছে, হারানো রাজনৈতিক জমি ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আবার কারও মতে, আইনি লড়াইয়ের ভবিষ্যৎও এই সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা নিয়েছে।
এই ছবিতে আর একটি নাম সমান তাৎপর্যপূর্ণ— চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। ভোটে হারের পরেও তিনি ছিলেন মমতার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মুখগুলির অন্যতম। রাজ্য সভাপতির দায়িত্বও পেয়েছিলেন। সেই তিনিই এখন ঋতব্রত শিবিরের জাতীয় কর্মসমিতিতে। একই ভাবে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সুদীপ রাহাও এখন নতুন শিবিরে গুরুত্বপূর্ণ পদে। অর্থাৎ, শুধু নেতা বদলাচ্ছেন না। বদলাচ্ছে সম্পর্কের সংজ্ঞাও।
অর্থাৎ এক সময় যাঁরা ছিলেন 'ঘোষিত শত্রু', আজ তাঁরা 'সহকর্মী'। আর যাঁরা ছিলেন 'দিদির লোক', তাঁদের অনেকেই এখন অন্য রাজনৈতিক ঠিকানায়। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কটাক্ষও সেই কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য, “যাঁরা আজ শুভেন্দু অধিকারীর বি-টিমে যাচ্ছেন, তাঁদেরই তো একদিন বিজেপি গরুচোর, কয়লাচোর, পাথরচোর বলত।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলার রাজনীতি এখন মতাদর্শের লড়াইয়ের চেয়ে অনেক বেশি অস্তিত্বের রাজনীতি। সেখানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ— সব কিছুর হিসাব একসঙ্গে কষা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিহাসও সম্ভবত সেখানেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেননি। অথচ তাঁর দলেই বছরের পর বছর একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া 'অহি-নকুলদের' আজ এক ছাতার তলায় এনে দিয়েছে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। এখন দেখার, এই সহাবস্থান ভোটের প্রয়োজন ফুরোলেই ভেঙে যায়, নাকি এটাই বাংলার রাজনীতির নতুন স্থায়ী সমীকরণ হয়ে ওঠে।