কলকাতা: বাংলায় প্রথম বার ক্ষমতায় আসার তিন মাসও পূর্ণ হয়নি। তার মধ্যেই দলের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে উঠছে তোলাবাজি, আর্থিক লেনদেন এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙার অভিযোগ। কোথাও স্থানীয় স্তরে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ, কোথাও আবার পুরনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে ‘বোঝাপড়া’র অভিযোগ ঘিরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বিজেপির অন্দরে। পরিস্থিতি সামলাতে এ বার সাংগঠনিক ‘শুদ্ধি অভিযান’-এ নামছে রাজ্য বিজেপি। এক ডজনেরও বেশি সাংগঠনিক জেলায় নেতৃত্ব বদলের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের খবর।
ক্ষমতায় আসার পরেই রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট করেছিলেন, দুর্নীতি বা তোলাবাজির অভিযোগে দলের কোনও নেতা-কর্মীকে রেয়াত করা হবে না। সেই অবস্থানেই এ বার সাংগঠনিক স্তরেও কড়া পদক্ষেপের পথে হাঁটছে পদ্ম শিবির। দলীয় সূত্রের দাবি, এখনও পর্যন্ত তোলাবাজি-সহ বিভিন্ন অভিযোগে ২২ জনকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির তরফে শোকজ করা হয়েছে অন্তত ২৫০ জনকে।
কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত ভাবে নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েই থামতে চাইছে না বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব। যে সব সাংগঠনিক জেলায় একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে, সেখানকার নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে জেলা সভাপতি-সহ গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কেন এই রদবদল?
দলীয় সূত্রের খবর, বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিজেপি নেতৃত্ব কয়েকটি এলাকায় ভিন্ন ছবি পেয়েছে। কোথাও নির্বাচনে তৃণমূল জয়ী হলেও সাংগঠনিক ভাবে তাদের ভিত দুর্বল হয়েছে। আবার সেই সুযোগে স্থানীয় তৃণমূলের একাংশের সঙ্গে বিজেপির স্থানীয় নেতাদের যোগাযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোথাও সেই যোগাযোগ রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, কোথাও তা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে গড়িয়েছে বলে দলের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে উঠে এসেছে।
বিজেপির অন্দরের আশঙ্কা, ক্ষমতার পালাবদলের পর স্থানীয় স্তরে দ্রুত প্রভাব বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় দলের কিছু নেতা পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে আপস করছেন। তার জেরে এক দিকে দলীয় শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে, অন্য দিকে সাধারণ মানুষের কাছে বিজেপির ভাবমূর্তিও ধাক্কা খাচ্ছে। বিশেষ করে তোলাবাজি বা বেআইনি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগকে কোনও ভাবেই প্রশ্রয় দিতে চাইছে না রাজ্য নেতৃত্ব।
এই পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি সাংগঠনিক জেলা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে বর্তমান নেতৃত্বের কাজকর্ম, নির্বাচনী ফল, সংগঠনের বিস্তার এবং দলীয় শৃঙ্খলা—সব কিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার ভিত্তিতেই নতুন মুখ আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে বিজেপি সূত্রে খবর।
‘জিরো টলারেন্স’ বার্তা
ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির একটি হল দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সামলানো। এত দিন বিরোধী দলে থাকার সময়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও তোলাবাজির অভিযোগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করেছিল বিজেপি। এখন ক্ষমতায় এসে একই ধরনের অভিযোগ নিজের দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
সেই কারণেই শুরু থেকেই ‘জিরো টলারেন্স’-এর বার্তা দিয়েছেন শমীক। দলীয় নেতৃত্বের বক্তব্য, ক্ষমতায় আসার অর্থ দলের নেতা-কর্মীদের জন্য অবাধ সুযোগ তৈরি হওয়া নয়। বরং সরকারে থাকার সময় সংগঠনের আচরণ আরও বেশি নজরদারির মধ্যে থাকবে।
তবে দলের একাংশের প্রশ্ন, শুধু সাসপেন্ড বা শোকজ করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? জেলা নেতৃত্বের উপর নজরদারি, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং সাংগঠনিক কাঠামোয় জবাবদিহি না বাড়ালে একই সমস্যা ফের তৈরি হতে পারে বলেও মত রয়েছে বিজেপির অন্দরে।
তিন মাসেই বদলে যাচ্ছে সমীকরণ
পালাবদলের আগে বিজেপির অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল, তৃণমূলের দীর্ঘ শাসনে স্থানীয় স্তরে ‘দলতন্ত্র’ এবং দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এখন সেই বিজেপিই ক্ষমতায়। ফলে প্রশাসনের পাশাপাশি দলের সংগঠন নিয়েও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দলের কোনও নেতা তোলাবাজি, বেআইনি লেনদেন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত—এমন অভিযোগ উঠলে তার রাজনৈতিক অভিঘাতও বেশি। বিজেপি নেতৃত্বের আশঙ্কা, শুরুতেই ব্যবস্থা না নিলে বিরোধীরা সেই অভিযোগকে হাতিয়ার করে সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রচার চালাবে।
তাই জেলা ধরে সংগঠন ‘ঝাড়াই-বাছাই’য়ের সিদ্ধান্ত। কোথাও পুরনো নেতৃত্বকে সরিয়ে নতুন মুখ, কোথাও দায়িত্বের পুনর্বণ্টন, আবার কোথাও একাধিক পদে পরিবর্তন—সব মিলিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহে রাজ্য বিজেপির সাংগঠনিক মানচিত্রে বড় বদল আসতে পারে।
ক্ষমতায় আসার মাত্র তিন মাসের মধ্যে দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, একের পর এক সাসপেনশন, শোকজ এবং এ বার জেলা নেতৃত্বে রদবদল—সব মিলিয়ে বিজেপির সামনে এখন মূল প্রশ্ন একটাই: ক্ষমতার সঙ্গে সংগঠনকে কত দ্রুত শৃঙ্খলায় আনা যায়। কারণ সরকারের পাশাপাশি দলের স্থানীয় মুখগুলির আচরণই শেষ পর্যন্ত বাংলায় বিজেপির নতুন শাসনের ভাবমূর্তি তৈরি করবে।