নিউজ ডেস্ক: বাংলার দুর্গাপুজো মানেই কাশফুল, ঢাকের বাদ্যি, আলোর ঝলকানি আর মহিষাসুরমর্দিনীর পরিচিত মূর্তি। কিন্তু পুরুলিয়ার জঙ্গলঘেরা দেউলঘাটায় দেবী দুর্গা যেন অন্য এক সময়ের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছেন। কংসাবতী নদীর তীরে প্রাচীন পোড়ামাটির মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের মাঝে অধিষ্ঠিত এই কৃষ্ণবর্ণা দেবীমূর্তি আজও ইতিহাস, পুরাণ এবং লোকবিশ্বাসের এক আশ্চর্য মেলবন্ধনের সাক্ষী।
পুরুলিয়ার আড়শা ব্লকের দেউলঘাটা একসময় ছিল মন্দির ও ধর্মীয় স্থাপত্যে সমৃদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ঐতিহাসিক গবেষণা অনুযায়ী, পাল-সেন যুগের সময়, আনুমানিক নবম-দশম শতাব্দীতে এই এলাকায় একাধিক মন্দির ও দেউল গড়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ গবেষক জে. ডি. বেগলার ও ই. টি. ডালটনের বিবরণেও এই অঞ্চলে প্রায় ১৫টি ছোট-বড় মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। সময়ের স্রোতে অবশ্য অধিকাংশই আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
দেউলঘাটার স্থাপত্যেও যেন লুকিয়ে রয়েছে প্রাচীন ভারতের নানা ধর্মীয় ধারার গল্প। রেখ-দেউল ধরনের মন্দিরগুলিতে পোড়ামাটি ও স্টুকোর সূক্ষ্ম কাজের পাশাপাশি বৌদ্ধ ও জৈন স্থাপত্যের প্রভাব চোখে পড়ে। ত্রিভুজাকৃতি বা কর্বেলড প্রবেশপথ, অলংকরণ এবং ভাস্কর্যের ধরন মনে করিয়ে দেয় সেই সময়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের কথা।
তবে দেউলঘাটার সবচেয়ে বড় বিস্ময়, প্রাচীন কষ্টিপাথরে খোদিত মহিষাসুরমর্দিনী। স্থানীয়ভাবে যিনি ‘কালো দুর্গা’ নামে পরিচিত। প্রচলিত দুর্গামূর্তির মতো এখানে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক বা গণেশ নেই। দেবীর দু’পাশে রয়েছে অষ্টমাতৃকার উপস্থিতি। দেবীর গায়ের কৃষ্ণবর্ণ যেন তাঁকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। মাথার উপরে রয়েছে বিশেষ চক্রস্তম্ভ, আর পায়ের নীচে ও চালচিত্রে খোদিত উড়ন্ত গন্ধর্বসদৃশ মূর্তি প্রাচীন ভাস্কর্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় দেবীর পায়ের অবস্থান। পরিচিত দুর্গামূর্তিতে সাধারণত ডান পা সিংহের উপর এবং বাঁ পা মহিষাসুরের উপর থাকে। কিন্তু দেউলঘাটার মূর্তিতে রয়েছে তার উল্টো বিন্যাস, ডান পা মহিষের উপর, বাঁ পা সিংহের উপর। যেন দেবীর সেই প্রাচীন রূপের মধ্যে যুদ্ধ, শক্তি এবং মহাশক্তির নিজস্ব এক প্রতীকী ভাষা লুকিয়ে আছে।
লোককথায় শোনা যায়, একসময় এই দেবীমূর্তি মন্দিরের ভিতরে নয়, একটি গাছের নীচে খোলা আকাশের তলায় পূজিত হতেন। মহালয়া থেকেই শুরু হয় চণ্ডীপাঠ। ধূপের গন্ধ, মন্ত্রোচ্চারণ আর জঙ্গলের নিস্তব্ধতার মধ্যে তখন মনে হয়, কয়েকশো বছর পেরিয়েও দেবী যেন একইভাবে পাহারা দিয়ে চলেছেন এই প্রাচীন ভূমিকে।
কিন্তু ইতিহাসের এই অমূল্য অধ্যায় আজ বিপন্ন। নদীভাঙন, জঙ্গল ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাচীন স্থাপত্য। ২০০২ সালে সংস্কারের সময় প্রবল বর্ষণে একটি বিশাল পোড়ামাটির মন্দির ধসে পড়ার ঘটনাও ঘটেছিল।
তবু ধ্বংসস্তূপের মাঝেও দেউলঘাটার কালো দুর্গা যেন এক অমোঘ বার্তা দিয়ে চলেছেন সভ্যতা বদলায়, মন্দির ভেঙে যায়, সময় মুছে দেয় বহু চিহ্ন; কিন্তু বিশ্বাস ও ইতিহাসের কিছু গল্প যুগের পর যুগ মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। দেউলঘাটার এই প্রাচীন দেবীমূর্তি তাই শুধু পুজোর প্রতিমা নয়, রাঢ় বাংলার বহু শতাব্দীর ধর্মীয় বিবর্তন, শিল্প ও লোকবিশ্বাসের এক জীবন্ত দলিল।
