পৃথিবীতে তখনও মানুষের অস্তিত্ব নেই। নেই পাখির কিচিরমিচির, নেই স্তন্যপায়ী প্রাণীর আধিপত্য। বিশাল এক মহাদেশ— গন্ডোয়ানা। সেই ভূখণ্ডে জলাভূমি, ঘন বন আর প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের আনাগোনা। আজ থেকে প্রায় ২১ কোটি (২১০ মিলিয়ন) বছর আগে সেই পৃথিবীতেই ঘুরে বেড়াত এক অজানা ডাইনোসর। কোটি কোটি বছর ধরে মাটির নীচে চাপা পড়ে থাকা তার কয়েকটি হাড়ই এবার খুলে দিল বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত।
আফ্রিকার দেশ জিম্বাবোয়েতে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন ডাইনোসরের এক নতুন প্রজাতির জীবাশ্ম। নতুন প্রজাতিটির নাম রাখা হয়েছে মুসাঙ্গো মাতুসাডোনােনসিস (Musango matusadonaensis)। গবেষকদের মতে, এটি ডাইনোসরদের প্রাথমিক বিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।
এই জীবাশ্ম উদ্ধার হয়েছে উত্তর জিম্বাবোয়ের লেক কারিবার (Lake Kariba) কাছে। ২০১৮ সালে একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল সেখানে অভিযানে গিয়ে কয়েকটি জীবাশ্মের হাড় খুঁজে পান। প্রথমে সেগুলিকে সাধারণ ডাইনোসরের অংশ বলেই মনে করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ গবেষণা, তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এগুলি আগে পরিচিত কোনও প্রজাতির সঙ্গে মেলে না। অবশেষে নিশ্চিত হয়, এটি সম্পূর্ণ নতুন এক ডাইনোসর। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে Journal of Systematic Paleontology-এ।
যে জীবাশ্মগুলি পাওয়া গিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে উরু, পায়ের নীচের অংশ এবং গোড়ালির হাড়। মাত্র কয়েকটি হাড় থেকেই বিজ্ঞানীরা প্রাণীটির গঠন, চলাফেরা এবং বিবর্তনগত অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন।
গবেষকদের অনুমান, ডাইনোসরটির কোমর পর্যন্ত উচ্চতা ছিল প্রায় দেড় মিটার এবং ওজন ছিল প্রায় ৩৯০ কিলোগ্রাম। এটি ছিল সোরোপোডোমর্ফ (Sauropodomorph) গোষ্ঠীর সদস্য— যে গোষ্ঠী থেকেই পরবর্তীকালে জন্ম নিয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণী, দীর্ঘ গলা ও বিশাল দেহের সোরোপড ডাইনোসররা।
এই আবিষ্কারের তাৎপর্য শুধু নতুন একটি ডাইনোসর পাওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানীদের মতে, ট্রায়াসিক যুগ ছিল এমন এক সময়, যখন ডাইনোসররা দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছিল এবং পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার শুরু করেছিল। সেই সময়ের জীবাশ্ম খুবই বিরল। ফলে এই নতুন প্রজাতি ডাইনোসরদের বিবর্তনের প্রথম অধ্যায় সম্পর্কে বহু অজানা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। নতুন এই ডাইনোসরের সঙ্গে আর্জেন্টিনা এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় আবিষ্কৃত কয়েকটি প্রাচীন ডাইনোসরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকতে পারে। এর অর্থ, যখন দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকা একই মহাদেশ গন্ডোয়ানা-র অংশ ছিল, তখন ডাইনোসররা সহজেই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিচরণ করত। এই আবিষ্কার সেই প্রাচীন ভূগোলেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষক দলের অন্যতম সদস্য কিম্বার্লি শ্যাপেলের মতে, আফ্রিকায় ডাইনোসরের জীবাশ্ম কম পাওয়া যাওয়ার কারণ জীবাশ্মের অভাব নয়, বরং পর্যাপ্ত অনুসন্ধানের অভাব। তাঁর কথায়, বিশ্বের অন্য অংশের তুলনায় আফ্রিকায় অনেক কম খনন হয়েছে। তাই ভবিষ্যতে আরও বহু অজানা ডাইনোসরের সন্ধান মিলতে পারে।
কোটি কোটি বছর ধরে নিশ্চুপ হয়ে পড়ে থাকা কয়েকটি হাড় আবারও মনে করিয়ে দিল, পৃথিবীর ইতিহাস এখনও পুরোটা লেখা শেষ হয়নি। প্রতিটি নতুন জীবাশ্ম শুধু একটি প্রাণীর পরিচয় দেয় না, বরং জানিয়ে যায়— আমাদের এই গ্রহের অতীত এখনও রহস্যে ভরা। আর সেই রহস্যের পরত খুলতেই হয়তো অপেক্ষা করছে আফ্রিকার মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা আরও অজস্র অজানা ডাইনোসর।