কলকাতা: ক্ষমতায় আসার আগে বিজেপির অন্যতম বড় রাজনৈতিক অস্ত্র ছিল ‘তোলাবাজি’ এবং ‘কাটমানি’র বিরুদ্ধে জনমত। সেই অস্ত্রই কি এ বার উল্টো ঘুরে দলের অন্দরের দিকে? অন্তত টানা দু’দিনে বিজেপির দুই শীর্ষ নেতার বক্তব্যে সেই প্রশ্নই জোরালো হয়ে উঠল।
শনিবার রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ১৫ দিনের ‘ডেডলাইন’ দিয়ে বলেছিলেন, দলের ভিতরে কোথাও কোথাও ‘বিচ্যুতি’ রয়েছে। আর তার ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। শুধু সতর্কবার্তা নয়, কার্যত স্বীকার করে নিলেন ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই তৃণমূল আমলের তোলাবাজ চক্রের একাংশ বিজেপির আশ্রয় খুঁজছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ, তাঁর অভিযোগ দলেরই কিছু নেতা সেই প্রলোভনে পা দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক অভিধানে এমন স্বীকারোক্তি সচরাচর শোনা যায় না। দিলীপের ভাষায়, “তোলাবাজি সংস্কৃতি এত সহজে উঠে যাবে, তা ভাবার কোনও কারণ নেই।” এই একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ল বাংলার ক্ষমতা পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠিন চিত্র। সরকার বদলালেই যে সামাজিক-রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক রাতারাতি বদলে যায় না, সেটাই যেন তুলে ধরতে চাইলেন তিনি।
তবে তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ, তৃণমূল আমলের দুর্নীতির সঙ্গে যুক্তদের প্রসঙ্গ। দিলীপের অভিযোগ, সেই চক্র এখন বিজেপির নেতাদের ঘিরে ধরছে। তাঁর কথায়, “দুর্নীতিবাজেরা আমাদের দলের নেতাদের কাছে আসার চেষ্টা করছে।”
কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। বরং দলের অন্দরেই আত্মসমালোচনার সুর তুলেছেন। কটাক্ষের সুরে বলেন, “আমাদের অনেক নেতা আছেন, যাঁরা নতুন এই মধুতে আসক্ত হয়ে যাচ্ছেন।”
‘নতুন মধু’ এই দুটি শব্দই রবিবারের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ক্ষমতার স্বাদ, প্রশাসনিক প্রভাব, স্থানীয় স্তরে দাপট সব মিলিয়ে যে নতুন আকর্ষণ তৈরি হয়েছে, সেটিকেই রূপক হিসেবে ব্যবহার করলেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, উদ্বেগ শুধু বিরোধী শিবিরের বিরুদ্ধে নয়; উদ্বেগ দলের ভিতরেও।
এর পরেই নাম না করে নিশানা নতুন প্রজন্মের কয়েক জন বিজেপি বিধায়ককে। দিলীপের বক্তব্য, ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। “নতুন ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে অনেকে ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। তাঁদের কথাবার্তা পাল্টে যাচ্ছে।”
এই মন্তব্য নিছক সাংগঠনিক সতর্কতা নয়, বরং ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির প্রথম বড় আত্মসমালোচনাও বটে। কারণ, দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতি করার পর হঠাৎ প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসা নেতাদের আচরণ নিয়ে দলের ভিতরেই যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, দিলীপের বক্তব্যে তার স্পষ্ট প্রতিফলন মিলল।
তবে বার্তার শেষ অংশটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। দিলীপ জানিয়ে দিলেন, দল সব কিছু দেখছে। এখনই ব্যবস্থা না হলেও সময় এলেই হিসেব হবে। তাঁর হুঁশিয়ারি, “ছ’মাস যেতে দিন, পার্টি সব হিসেব করবে।” এই ‘ছ’মাস’ শব্দবন্ধের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। একদিকে প্রশাসনকে সময় দেওয়া, অন্যদিকে সংগঠনের ভিতরে তথ্য সংগ্রহ— দু’য়েরই ইঙ্গিত রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
প্রসঙ্গত, শনিবার শমীক ভট্টাচার্যও একই সুরে বলেছিলেন, “আরও ১৫ দিনের সময় দিচ্ছি। তার পরে যেটা হবে বুঝতে পারবেন।” এমনকি তাঁর বহুল আলোচিত ‘ডিম থেরাপি’-র প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “এই ডিম কিন্তু ঘুরে গিয়ে অন্য দিকেও পড়তে পারে।” অর্থাৎ বিরোধীদের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক ভাষা এত দিন ব্যবহার হয়েছে, প্রয়োজনে তা দলের অন্দরেও প্রয়োগ হতে পারে এমনই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন রাজ্য সভাপতি।
টানা দু’দিনে শমীক ও দিলীপের বক্তব্যকে নিছক রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখছে না ওয়াকিবহাল মহল। বরং ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ‘দুর্নীতিমুক্ত বিকল্প’ হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তি ধরে রাখা। সেই ভাবমূর্তিতে যাতে আঁচ না লাগে, সে জন্যই প্রকাশ্যে দলের নেতাদের সতর্ক করার পথ বেছে নিয়েছে নেতৃত্ব।
বিরোধী থাকাকালীন বিজেপির অন্যতম স্লোগান ছিল, ‘তোলাবাজ মুক্ত বাংলা’। ক্ষমতায় আসার ছ’মাসের মধ্যেই সেই একই প্রশ্ন যদি দলের অন্দরেই উঠে আসে, তবে তা নিঃসন্দেহে নতুন সরকারের জন্য রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ। আর সেই অস্বস্তির কথাই হয়তো সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করে দিলেন দিলীপ ঘোষ, ক্ষমতা এসেছে, কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে যেন পুরনো সংস্কৃতি ফিরে না আসে।