কলকাতা: দিল্লির অস্বস্তি আর চাপা থাকছে না। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই দলের নিচুতলা থেকে একের পর এক তোলাবাজি, দুর্নীতি, দলীয় কোন্দল এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ সামনে আসায় নড়েচড়ে বসেছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। পরিস্থিতি সামাল দিতে এ বার বাংলায় আসছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন। সেপ্টেম্বরের গোড়ায় তাঁর তিন দিনের বঙ্গ সফরের কর্মসূচি চূড়ান্ত হওয়ার পথে।
শুধু কলকাতায় বসে বৈঠক নয়, এ বার রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে সাংগঠনিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবেন বিজেপি সভাপতি। পাহাড় ও তরাই-ডুয়ার্স থেকে উত্তরবঙ্গ, তার পর দক্ষিণবঙ্গ—জোন ধরে বৈঠক করার কথা রয়েছে তাঁর। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাঁদের অভিযোগ শুনবেন, সংগঠনের রিপোর্ট নেবেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশও দেবেন বলে দলীয় সূত্রে খবর।
বঙ্গ বিজেপির একাংশের বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করেই মূলত সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রে উঠে আসা অভিযোগ অনুযায়ী, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিজেপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে টাকা চাওয়া, ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষের উপর চাপ তৈরি করা কিংবা নানা কাজে ‘দলের সঙ্গে বোঝাপড়া’র নামে অর্থ দাবি করার অভিযোগ উঠছে। অভিযোগের সত্যতা নিয়ে পৃথক ভাবে তদন্তের প্রয়োজন থাকলেও, একের পর এক ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উদ্বেগ বেড়েছে।
শুধু তোলাবাজিই নয়, দলের অন্দরের কোন্দলও দিল্লির চিন্তা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে তৃণমূল থেকে বিজেপির দিকে আসা বিদ্রোহী সাংসদদের ঘিরে দলের পুরনো কর্মীদের সঙ্গে নতুনদের টানাপড়েন প্রকাশ্যে এসেছে। আসন্ন কলকাতা ও হাওড়া পুরভোটে ওই সাংসদদের ঘনিষ্ঠদের প্রার্থী করার জন্য কোনও রকম লবিবাজি বরদাস্ত করা হবে না—কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে এমন বার্তাও দেওয়া হয়েছে বলে খবর।
এই আবহেই বৃহস্পতিবার দিল্লিতে নীতিন নবীনের সঙ্গে বৈঠক করেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। পরে তিনি পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতা তথা দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বনসলের সঙ্গেও বৈঠক করেন। শমীকের বক্তব্য, সেপ্টেম্বরের গোড়ায় তিন দিনের সফরে রাজ্যে এসে নীতিন সাংগঠনিক বৈঠক করবেন।
দিল্লিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বঙ্গ বিজেপির নেতাদের একের পর এক বৈঠকও পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাচ্ছে। সংসদের বাদল অধিবেশনের মধ্যেই একাধিক বার সুনীল বনসলের সঙ্গে দেখা করেছেন শমীক। অন্য দিকে কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী তথা রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি সুকান্ত মজুমদারও বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) বিএল সন্তোষের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সুকান্ত অবশ্য সেটিকে সৌজন্য সাক্ষাৎ বলেই জানিয়েছেন।
তবে দলের পুরনো কর্মীদের একাংশের প্রশ্ন আরও গভীরে। ক্ষমতায় আসার আগে যে বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘কাটমানি’, ‘তোলাবাজি’ ও দুর্নীতির অভিযোগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করেছিল, ক্ষমতার তিন মাসের মধ্যেই সেই একই ধরনের অভিযোগ কেন দলের নিচুতলার নেতাদের বিরুদ্ধে উঠছে? সম্প্রতি দলের তরফেও বিভিন্ন স্তরে শৃঙ্খলা রক্ষার বার্তা দেওয়া হয়েছে এবং তোলাবাজির অভিযোগে একাধিক নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও প্রকাশ্যে এসেছে।
নীতিনের সফরের সামনে তাই শুধু সাংগঠনিক বৈঠক নয়, বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের ভাবমূর্তি। নতুন সরকার, নতুন প্রশাসন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিজেপি কত দ্রুত নিচুতলার সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে, তার উপরই অনেকটা নির্ভর করছে আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ। দিল্লির বার্তা স্পষ্ট—ক্ষমতার সঙ্গে দলের নামে ব্যক্তিগত স্বার্থের রাজনীতি মিশে গেলে তা কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। এখন দেখার, বাংলায় এসে নীতিন নবীন সেই বার্তা কতটা কঠোর ভাবে পৌঁছে দিতে পারেন।