বিশেষ প্রতিবেদন: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র। ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সালে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৬ সালে ৭৯ বছরে পা দিলেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জুড়ে রয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। বিশেষ করে নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া ও বাস্তবায়িত হয়।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি ছিল নিরাপত্তা সহযোগিতা। ২০১৫ সালের ভারত-বাংলাদেশ যৌথ ঘোষণায় দুই দেশ সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে সহযোগিতা, তথ্য আদানপ্রদান এবং এক দেশের ভূখণ্ড অন্য দেশের স্বার্থবিরোধী কাজে ব্যবহার না করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। একই সময়ে জাল ভারতীয় মুদ্রা, মানবপাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলাতেও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিভিন্ন কাঠামো তৈরি ও কার্যকর করা হয়।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪,০৯৬.৭ কিলোমিটার। এই সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গ, অসম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত। সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত বৈঠক, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় তথ্য আদানপ্রদানের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ভারতীয় সরকারি নথিতে ২০১১ সাল থেকেই Coordinated Border Management Plan (CBMP)-এর কথা উল্লেখ রয়েছে।
২০১৫ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি (Land Boundary Agreement) ছিল ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম ঐতিহাসিক মাইলফলক। ১৯৭৪ সালের চুক্তি এবং ২০১১ সালের প্রোটোকলের বাস্তবায়নের জন্য ২০১৫ সালের ৬ জুন দুই দেশ Instrument of Ratification বিনিময় করে। এরপর ৩১ জুলাই ২০১৫ মধ্যরাত থেকে দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হয়। এর ফলে কয়েক দশক ধরে চলা ছিটমহল-সংক্রান্ত জটিলতার অবসান ঘটে।
শুধু নিরাপত্তা নয়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়াতেও শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে একাধিক প্রকল্প এগিয়ে যায়। এর মধ্যে আখাউড়া-আগরতলা ক্রস-বর্ডার রেল সংযোগ, খুলনা-মোংলা রেললাইন এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরি হয়। ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প উদ্বোধন করেন, আখাউড়া-আগরতলা ক্রস-বর্ডার রেল লিঙ্ক, খুলনা-মোংলা পোর্ট রেল লাইন এবং মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টের দ্বিতীয় ইউনিট। ভারতীয় সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পগুলির লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক যোগাযোগ ও জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা।
জ্বালানি সহযোগিতাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। ২০২৩ সালের মার্চে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন উদ্বোধন করা হয়, যার মাধ্যমে ভারত থেকে বাংলাদেশে হাই-স্পিড ডিজেল পরিবহনের ব্যবস্থা তৈরি হয়। একই সময়ে মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রকল্পও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আসার পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠন, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের বিষয়টিও দুই দেশের সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে রয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার জন্মদিনে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ভারতের নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সহযোগিতা এবং দীর্ঘদিনের ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক সম্পর্কের বিবর্তনও সামনে আসে।
তবে এই সম্পর্কের মূল্যায়ন রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তার পাশাপাশি সম্পর্কটি কতটা সরকার-কেন্দ্রিক ছিল এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক কতটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গভীর হয়েছিল, এই প্রশ্ন নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
