হাবিবুর রহমান, ঢাকা : বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন ও ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণায় ড. ইউনূসের অন্তবর্তী সরকারের শাসনামলে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামি লিগের নেতা-কর্মীরা এবার চাঙ্গা বোধ করছেন বলে
সংশ্লিষ্টমহলের অভিমত। এরই প্রতিফলন দেখা গেল ঢাকাসহ কয়েকস্থানে তাদের মিছিল বের করার চেষ্টা। পুলিশ বলছে, রাজধানী ঢাকার বনানী এলাকায় ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতির সময় আওয়ামি লিগ ও এর সহযোগী সংগঠন গত রাতে মিছিল বের করার চেষ্টাকালে সাতজনকে আটক করা হয়েছে। এরআগে ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন জায়গা, মুন্সিগঞ্জ ও কুমিল্লা জেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগ, যুবলিগ ও ছাত্রলিগের ঝটিকা মিছিল বের করে। মিছিলের ছবি ও ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে বন্দনগর চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানাধীন চশমা হিল এলাকায় বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দিবাগত গভীর রাতে আওয়ামি লিগ নেতা মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। জানা যায়, ৬-৭ জনের একটি দল তার বাসভবন লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমাসদৃশ বস্তু নিক্ষেপ করে। এতে আগুনের সূত্রপাত হলে আশপাশের লোকজন ছুটে যায়। এসময় হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। চট্টগ্রাম নগরের সাবেক মেয়র প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগ সরকারের সাবেক
শিক্ষামন্ত্রী। গত দুই বছরে চশমা হিলের এই বাসভবনে চার দফায় হামলা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একটি মিছিল থেকে প্রথম
দফায় হামলা চালানো হয়।ওই বছরের ৫ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় হামলা ও লুটপাট ঘটে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তৃতীয় দফায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটে। বর্তমানে বাড়িটি খালি পড়ে আছে।
এদিকে সূত্র বলছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগ, যুবলিগ ও ছাত্রলিগের নেতাকর্মীরা সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ও রাজধানীতে পুনরায় সংগঠিত হয়ে ঝটিকা মিছিল ও মশাল মিছিলের চেষ্টা চালিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনী এসব ঘটনায় বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার
করেছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামের বিপরীত পাশে মশাল মিছিলের প্রস্তুতির সময় লিগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ৭ জন কর্মীকে পুলিশ আটক
করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৭০টি মশাল ও ব্যানার উদ্ধার করা হয়।এর আগে ঢাকা মহানগরীর পল্লবী ও মিরপুর এলাকা এবং চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও
কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত এই সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা চালায়। অবশ্য বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুলিশ ও গোয়েন্দা
সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি মতবিনিময়ের সুযোগ
দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ। ভারত সরকারকে আগে থেকে উদ্বেগ জানানোর পরেও এ আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।বিদেশ মন্ত্রক থেকে পাঠানো সংবাদে ক্ষোভ ও খেদের কথা জানানো হয়।
একই সঙ্গে কারাবাস বা আরও খারাপ কিছুর শঙ্কা সত্ত্বেও ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। দিল্লির এ অনুষ্ঠানে অন্যদের
মধ্যে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনার ছেলে সজিব ওয়াজেদ
জয়। ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান প্রথমে একটি রেকর্ড করা বক্তব্য দেন। পরে সরাসরি ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। তবে তখন কোনো কথা বলেননি। এরপরেই তার পৈত্রিক ভিটা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা মাগুরায় আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা
হয়। এ ছাড়া সশরীরে মঞ্চে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। এ সংবাদ সম্মেলনের পর ঢাকায় বিদেশ মন্ত্রক
বিবৃতিতে জানায়, পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ
ক্ষুব্ধ। বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি
বলেছেন, ‘শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ কেন দিল—এটি আমাদের প্রশ্ন।’ গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ
ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। তখন থেকে তিনি ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ভারত তাঁকে
আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেখানে আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন, তাঁকে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হলো। বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার কেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর এই
সুযোগ দিল?’ অপরদিকে ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তাবনিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জন্য উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয় বলে উল্লেখ করেছেন বিদেশ প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তাই বাংলাদেশের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক চায়, সেই সিদ্ধান্ত ভারতকেই নিতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার বিকেলে বিদেশ মন্ত্রকে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে শেখ হাসিনার সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে এই অভিমত দিয়েছেন
প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। শামা ওবায়েদ বলেন, বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে
কূটনৈতিক ভাষায় যতটুকু বোঝানো সম্ভব, সরকার তা বলার চেষ্টা করেছে। এর আগেও বাংলাদেশ বারবার ভারতকে বলেছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে তারা ঠিক কেমন সম্পর্ক চায়, সে বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। এই জঙ্গিবাদের তত্ত্বটা আওয়ামি লিগের পুরোনো নোংরা রাজনীতি। এটাই তারা এখন বিদেশের
মাটিতে বসে আবার নতুন করে করার চেষ্টা করছে। অথচ তাদের নিজেদের হাতে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।