কলকাতা: একদিকে স্মার্ট সিটি, অন্যদিকে জমির অবস্থান নির্ধারণে এখনও ভরসা শতাব্দীপ্রাচীন ব্রিটিশ আমলের মানচিত্র ! কলকাতা পুরসভার সংযুক্ত এলাকায় রাস্তা, জমির সীমানা ও প্রকৃতি নির্ধারণে এখনও ব্যবহার করা হচ্ছে 1903 এবং 1928 সালে তৈরি মৌজা ম্যাপ । আর সেই পুরনো ও বহু ক্ষেত্রে অস্পষ্ট নকশাকেই কেন্দ্র করে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং হয়রানির অভিযোগ উঠেছে কলকাতা পুরসভার ভ্যালুয়ার অ্যান্ড সার্ভেয়ার (Valuer & Surveyor) বিভাগের বিরুদ্ধে ।
তরাতলা নির্মাণ-কাণ্ডের পর শহরের নির্মাণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে, ঠিক সেই সময়েই লাইসেন্সড বিল্ডিং সার্ভেয়ারদের (এলবিএস) একাংশ কলকাতা পুরসভার প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডের সঙ্গে বৈঠক করে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেন । তাঁদের দাবি, সংযুক্ত এলাকার জমি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে এখনও একশো বছরেরও বেশি পুরনো ব্রিটিশ আমলের মানচিত্র ব্যবহার করা হচ্ছে । অথচ গত এক শতকে জমির প্রকৃতি, রাস্তার অবস্থান, খাল-বিল, জলাভূমি ও বসতির বিস্তার আমূল বদলে গিয়েছে । ফলে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারি নথির ফারাক ক্রমশ বাড়ছে ।
এলবিএসদের অভিযোগ, পুরনো মানচিত্রের অস্পষ্টতাকেই হাতিয়ার করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে । কোথাও জলাভূমিকে বাস্তুভিটে দেখানো হচ্ছে কোথাও আবার বসতজমিকে জলাজমি বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে । এতে সাধারণ মানুষ যেমন বিপাকে পড়ছেন, তেমনই অনুমোদন বা নথি সংশোধনের নামে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের সুযোগও তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ । তাঁদের দাবি, এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে একাংশের অসাধু চক্র মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে ।
এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে পুরসভায় অবিলম্বে রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি চালুর দাবি জানিয়েছেন লাইসেন্সড বিল্ডিং সার্ভেয়াররা । তাঁদের বক্তব্য, স্যাটেলাইট-নির্ভর এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জমির প্রকৃত অবস্থান, সীমানা, আয়তন, জলাভূমির অস্তিত্ব, খাল-বিল, বৃক্ষের অবস্থান থেকে শুরু করে জমির পরিবেশগত চরিত্র পর্যন্ত অত্যন্ত নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব । এতে জমি সংক্রান্ত বিরোধ যেমন কমবে, তেমনই নির্মাণ অনুমোদন প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতা আসবে ।
পুরসভা সূত্রের খবর, অতীতে প্রাক্তন পুর কমিশনার ধবল জৈনের আমলে এই প্রযুক্তি চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল । খড়গপুর আইআইটি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বা শিবপুরের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় ছিল । তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি । বর্তমানে কলকাতার পুরনো 1 থেকে 100 নম্বর ওয়ার্ডে আধুনিক জিআইএস-ভিত্তিক ডিজিটাল ম্যাপিং ব্যবহার হলেও সংযুক্ত এলাকার বড় অংশ এখনও ব্রিটিশ আমলের মৌজা ম্যাপের উপর নির্ভরশীল ।
বৈঠকে লাইসেন্সড বিল্ডিং সার্ভেয়াররা আরও দাবি করেন, বিল্ডিং রুল 22 অনুযায়ী নির্মাণকাজ শুরুর আগে 'কমেন্সমেন্ট নোটিশ' ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হোক । পাশাপাশি, নির্মাণ অনুমোদন থেকে কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত বাড়ির মালিক, লাইসেন্সড বিল্ডিং সার্ভেয়ার এবং পুরসভার দায়িত্ব স্পষ্ট করতে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) তৈরির প্রস্তাবও দেন তাঁরা ।
সূত্রের খবর, প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে বিষয়গুলি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন । তিনি ডেপুটি চিফ মিউনিসিপ্যাল ল অফিসারের সঙ্গে আলোচনা করে এসওপি তৈরির পরামর্শ দেন । পাশাপাশি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মিউনিসিপ্যাল বিল্ডিং কমিটির বৈঠক ফের চালু করার বিষয়েও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন ।
ইতিমধ্যেই ভ্যালুয়ার অ্যান্ড সার্ভেয়ার বিভাগের কাজকর্ম খতিয়ে দেখতে যুগ্ম কমিশনার পদমর্যাদার এক আধিকারিককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে পুরসভা সূত্রের খবর । ফলে প্রশ্ন উঠছে, ডিজিটাল যুগে কলকাতার সংযুক্ত এলাকায় আর কতদিন ব্রিটিশ আমলের মানচিত্রের উপর নির্ভর করবে পুর প্রশাসন ? নাকি এবার আধুনিক প্রযুক্তির হাত ধরেই বদলাবে জমি জরিপ ও নির্মাণ অনুমোদনের গোটা ব্যবস্থা ? সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের ।