কলকাতা: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অশান্তির আবহ কাটিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ ফেরাতে সোমবার ডাকা হয়েছিল ‘অল স্টেকহোল্ডার’ বৈঠক। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, সব পক্ষকে এক টেবিলে এনে সমস্যার সমাধানের পথ খোঁজা। কিন্তু বৈঠক শেষ পর্যন্ত সেই ঐক্যের ছবি দেখাতে পারল না। বরং পড়ুয়াদের একাংশের একাধিক দাবি, ABVP-র মাঝপথে বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া এবং ক্যাম্পাসে পুলিশি নজরদারি বাড়ানো নিয়ে মতবিরোধে ফের প্রকাশ্যে এল যাদবপুরের ছাত্র রাজনীতির টানাপড়েন।
বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির তরফে বৈঠকে চারটি মূল দাবি তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের প্রথম দাবি, স্টুডেন্ট গ্রিভ্যান্স রিড্রেসাল সেলের চেয়ারম্যানের পদ থেকে প্রাক্তন উপাচার্য বুদ্ধদেব সাউকে সরাতে হবে। দ্বিতীয়ত, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কোনও ক্লাস নিতে দেওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে যাঁদের দেখা গিয়েছে, তদন্ত চলাকালীন তাঁদের সাসপেন্ড করে রাখতে হবে। চতুর্থত, বর্তমান তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করে সেখানে পড়ুয়াদের প্রতিনিধি রাখতে হবে।
পড়ুয়াদের বক্তব্য, ঘটনার তদন্ত নিরপেক্ষ এবং বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে এই পদক্ষেপগুলি জরুরি। তাঁদের দাবি, তদন্ত চলাকালীন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্বাভাবিক ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে যুক্ত থাকলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
এই চার দাবির পাশাপাশি আরও দু’টি দাবি তুলেছেন পড়ুয়ারা। দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকা ইউনিয়ন নির্বাচন করতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসি বৈঠকও নিয়মিত করার দাবি উঠেছে। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক অশান্তির তদন্তের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোও সচল করার দাবি জানানো হয়েছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের SFI ইউনিটের ছাত্রী এষণার বক্তব্য, “আমাদের মূলত এই চারটি দাবি রয়েছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন নির্বাচন করতে হবে এবং দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ থাকা ইসি বৈঠকও করতে হবে।” পড়ুয়াদের হুঁশিয়ারি, দাবি না মানা পর্যন্ত ঘেরাও এবং অবস্থান-বিক্ষোভ চলবে। ফলে বৈঠক হলেও আন্দোলন প্রত্যাহারের কোনও ইঙ্গিত মেলেনি।
কেন বৈঠক ছাড়ল ABVP?
এ দিনের বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল ABVP-র প্রতিনিধি মাঝপথে বেরিয়ে যাওয়া। সংগঠনের অভিযোগ, ‘অল স্টেকহোল্ডার’ বৈঠকের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি সংগঠন থেকে এক জন করে প্রতিনিধি থাকার কথা। সেই নিয়ম মেনেই ABVP-র এক জন কর্মসমিতির সদস্য বৈঠকে উপস্থিত হয়েছিলেন।
ABVP-র স্টেট মিডিয়া ইনচার্জ অনন্তের দাবি, পরে দেখা যায়, বামপন্থী সংগঠনের এক জন প্রতিনিধির জায়গায় একাধিক ছাত্রছাত্রী বৈঠকে ঢুকে পড়েছেন। এই ‘বাড়তি প্রতিনিধি’ থাকার প্রতিবাদেই তাঁদের প্রতিনিধি বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। ABVP-র বক্তব্য, সব সংগঠনের জন্য যদি সমান নিয়ম নির্ধারিত থাকে, তা হলে সেই নিয়ম সকলের ক্ষেত্রেই সমান ভাবে কার্যকর করতে হবে। ফলে যে বৈঠক সব পক্ষকে একসঙ্গে নিয়ে বসার উদ্দেশ্যে ডাকা হয়েছিল, সেখানে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নেই তৈরি হল নতুন বিরোধ।
বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরও অবশ্য ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে ABVP। তদন্ত দ্রুত শেষ করা, ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি তুলেছে তারা।
এ দিনের বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুটা পরে বৈঠক শুরু হওয়ায় অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘ (উচ্চশিক্ষা)-এর প্রতিনিধিরা থাকতে পারেননি। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ই-মেল করে নিজেদের বক্তব্য জানায় সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, গভীর রাতে জিবি বৈঠক কে ডেকেছিল এবং কী পরিস্থিতিতে সেই বৈঠক হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে একটি পুলিশ আউটপোস্টের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তারা মত জানিয়েছে।
এই প্রস্তাবেই আপত্তি পড়ুয়াদের একাংশের। SFI-র এষণার বক্তব্য, “এখনই ক্যাম্পাসের ভিতরে পুলিশ আউটপোস্টের প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না। বরং নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো উচিত।” তাঁদের যুক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হলে ক্যাম্পাসের ভিতরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নজরদারি আরও বাড়ানোর পক্ষেও সওয়াল করেছেন তাঁরা।
শান্তির বৈঠক, কিন্তু মতের মিল কোথায়?
ফলে সোমবারের বৈঠকে যাদবপুরের অচলাবস্থা কাটানোর কোনও সহজ সূত্র বেরিয়ে এল না। বরং একাধিক প্রশ্ন আরও স্পষ্ট হয়ে সামনে এল।
পড়ুয়াদের দাবি—তদন্তে দ্রুত পদক্ষেপ, বুদ্ধদেব সাউকে পদ থেকে সরানো, তদন্ত চলাকালীন তাঁকে ক্লাস থেকে বিরত রাখা, সিসিটিভিতে চিহ্নিতদের সাসপেন্ড করা এবং তদন্ত কমিটিতে পড়ুয়া প্রতিনিধি রাখা। পাশাপাশি ইউনিয়ন নির্বাচন এবং ইসি বৈঠক চালুর দাবিও রয়েছে।
ABVP-র আপত্তি মূলত বৈঠকে প্রতিনিধিত্বের নিয়ম নিয়ে। তাদের অভিযোগ, এক পক্ষের জন্য এক জন প্রতিনিধির নিয়ম থাকলেও অন্য পক্ষের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। সেই কারণেই বৈঠক ছেড়েছেন তাদের প্রতিনিধি।
অন্য দিকে, ক্যাম্পাসে পুলিশ আউটপোস্ট হবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে মতভেদ। কেউ চাইছেন পুলিশি উপস্থিতি বাড়ুক, আবার পড়ুয়াদের একাংশের দাবি, পুলিশ নয়, বাড়ানো হোক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
সব মিলিয়ে, যাদবপুরে শান্তি ফেরানোর জন্য যে বৈঠক, সেই বৈঠকেই ফের ছাত্র রাজনীতির বিভাজন স্পষ্ট। এক দিকে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের ঘেরাও-অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি, অন্য দিকে ABVP-র বৈঠক বয়কট—দুইয়ের মাঝে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এখন সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
এখন দেখার, কর্তৃপক্ষ পড়ুয়াদের দাবিগুলি নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং ABVP-সহ অনুপস্থিত সংগঠনগুলিকে নিয়ে ফের কোনও সর্বদলীয় বা সর্বপক্ষীয় আলোচনার উদ্যোগ হয় কি না। কারণ বৈঠক বসেছে, মতামতও দেওয়া হয়েছে—কিন্তু যাদবপুরে শান্তি ফেরানোর আসল সমঝোতাটা এখনও অধরাই।