কলকাতা: দুর্গাপুজোর ক’দিন কলকাতা যেন অন্য এক শহর। সকাল গড়াতেই রাস্তায় মানুষের ঢল, সন্ধ্যা নামলে ভিড় আরও ঘন। এক প্যান্ডেল থেকে আর এক প্যান্ডেলে ছুটতে ছুটতে রাত কখন যে ভোর হয়ে যায়, তার হিসাব থাকে না কারও। শহরের এই পুজো দেখতে প্রতি বছর কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় লাখো মানুষের ভিড় হয়। তাঁদের বড় অংশই ভরসা রাখেন লোকাল ট্রেনে। ফলে পুজোর রাতে বাড়ি ফেরার ট্রেন মিলবে কি না, ভিড়ের চাপে যাত্রা কতটা স্বস্তিদায়ক হবে, এই চিন্তা থাকে অনেকেরই।
এ বার সেই চিন্তা কিছুটা কমাতে বড় পদক্ষেপ করল শিয়ালদহ ডিভিশন। পুজোর অতিরিক্ত ভিড় সামলাতে ষষ্ঠী থেকে দশমী, অর্থাৎ ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ৫১টি স্পেশাল ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পূর্ব রেল। এর মধ্যে ৩৮টি ট্রেন চলবে গভীর রাত পর্যন্ত, আর সন্ধ্যার দিকে যাত্রীদের বাড়তি চাপ সামলাতে চলবে আরও ১৩টি স্পেশাল ট্রেন।
গত বছর দুর্গাপুজোয় শিয়ালদহ ডিভিশনে ৩১টি স্পেশাল ট্রেন চালানো হয়েছিল। এ বার সেই সংখ্যা এক ধাক্কায় বেড়ে ৫১। অর্থাৎ পুজোর ভিড় সামলাতে বাড়তি পরিষেবায় বিশেষ জোর দিচ্ছে রেল। শুধু স্পেশাল ট্রেন নয়, পুজোর দিনে লোকাল ট্রেনের স্টপেজ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুপুর ২টোর পর থেকে শিয়ালদহ ডিভিশনের সমস্ত গ্যালপিং লোকাল প্রতিটি স্টেশনে দাঁড়াবে। ফলে ছোট স্টেশন থেকে পুজো দেখতে বেরোনো কিংবা রাতের দিকে বাড়ি ফেরার ক্ষেত্রে যাত্রীদের সুবিধা বাড়বে।
উৎসবের মরসুমে দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্যও রয়েছে বাড়তি ব্যবস্থা। ১০ থেকে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে শিয়ালদহ ডিভিশনে চলবে ৮০টি দূরপাল্লার স্পেশাল ট্রেন। গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৫০। অর্থাৎ এ বার দূরপাল্লার স্পেশাল ট্রেনও বাড়ানো হয়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবে।
পুজোর আগেই ভিড় বাড়তে শুরু করে লালগোলা সেকশনে। সেই চাপ সামলাতে ১০ থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে চারটি স্পেশাল ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। উৎসবের দিনগুলিতে কোথায় কতটা ভিড় হচ্ছে, কী ভাবে যাত্রীদের নিরাপদে স্টেশনে ঢোকানো ও বের করা যায়—সেই ‘ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট’-এর দিকেও বিশেষ নজর রাখছে রেল।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও থাকছে কড়া নজরদারি। শিয়ালদহ মেন, নর্থ এবং সাউথ সেকশনে লক্ষ লক্ষ যাত্রীর কথা মাথায় রেখে ২৪ ঘণ্টার ওয়াররুম চালু থাকবে। স্টেশন ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় লাগাতার সিসি ক্যামেরায় নজরদারি চলবে। পুজোর রাতে বাড়তি ভিড়ের মধ্যে যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে দিকে নজর রাখবেন রেলকর্মী ও আধিকারিকেরা।
টিকিট কাটার ঝক্কি কমাতেও নেওয়া হয়েছে একাধিক পদক্ষেপ। রানাঘাটে চালু করা হবে অস্থায়ী বুকিং কাউন্টার। পাশাপাশি বারাকপুরে ইতিমধ্যেই নতুন টিকিট কাউন্টার চালু হয়েছে। ফলে পুজোর ভিড়ে টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর সমস্যা অনেকটাই কমবে বলে আশা রেলের।
শিয়ালদহ-কৃষ্ণনগর শাখাতেও যাত্রীদের জন্য রয়েছে নতুন ব্যবস্থা। বাদকুল্লা স্টেশনে পরীক্ষামূলক ভাবে চারটি এসি লোকালের স্টপেজ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে শান্তিপুর-কৃষ্ণনগর রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে এক জোড়া ট্রেন চলত, এ বার সেখানে চলবে দু’জোড়া ট্রেন। দক্ষিণ শাখাতেও রাতের যাত্রীদের জন্য সুখবর। শিয়ালদহ-বজবজ লাইনে যুক্ত হয়েছে একটি নতুন রাতের ট্রেন।
শিয়ালদহ থেকে রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে ছেড়ে ট্রেনটি বজবজ পৌঁছবে রাত ১১টা ৪৩ মিনিটে। ফিরতি পথে বজবজ থেকে ট্রেন ছাড়বে রাত ১১টা ৫৪ মিনিটে এবং শিয়ালদহে পৌঁছবে রাত ১২টা ৪৮ মিনিটে। অর্থাৎ এ বার পুজোর রাত শুধু ঠাকুর দেখেই শেষ নয়, বাড়ি ফেরার পথটাও কিছুটা সহজ করার চেষ্টা করছে রেল। শহরের আলো, প্যান্ডেলের ভিড় আর রাতজাগা কলকাতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাত গভীর হলেও ট্রেন পরিষেবা সচল রাখতে প্রস্তুত শিয়ালদহ ডিভিশন।
লক্ষ্য একটাই, পুজোর আনন্দে যেন যাতায়াতের ভোগান্তি বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। নিরাপত্তা, বাড়তি ট্রেন, অতিরিক্ত স্টপেজ এবং টিকিট ব্যবস্থার উপর জোর দিয়ে এ বার উৎসবের পাঁচ দিন যাত্রীদের জন্য আরও মসৃণ ও নিরাপদ রেলযাত্রা নিশ্চিত করতে চাইছে পূর্ব রেল।
