কলকাতা: এক সময়ে যে রাজপথে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয় দেখলেই উঠত জয়ধ্বনি, সেই বাংলাতেই ক্ষমতা হারানোর তিন মাস চার দিনের মধ্যে তাঁর গাড়ি ঘিরে উঠল ‘চোর চোর’ স্লোগান। গাড়ি লক্ষ্য করে জুতো, ইট ছোড়ার অভিযোগ। তার ৭১ দিন আগে, ৩০ মে সোনারপুরে একই ভাবে বিক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ডিম ছোড়ার অভিযোগ, হেনস্থার মধ্যে জামা ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। তৃণমূলের দুই শীর্ষ নেতার পর পর এমন অভিজ্ঞতা তাই নিছক দু’টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, না কি ক্ষমতার পালাবদলের পর বাংলার রাজনৈতিক বাতাবরণ সত্যিই আমূল বদলে গিয়েছে—সেই প্রশ্নই এখন সামনে।
রবিবার দুপুরে এক তৃণমূল কর্মীর পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন মমতা। গাড়ির সামনের আসনে ছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দোলা সেন। সেই সময়ই তাঁর কনভয় আটকে বিক্ষোভ শুরু হয় বলে অভিযোগ। ওঠে ‘চোর চোর’ স্লোগান। ‘ওই দেখো চোর এসেছে’ বলেও কটাক্ষ করা হয়। মমতার দাবি, তাঁর গাড়িতে প্রচুর ইট ছোড়া হয়েছে এবং প্রায় এক ঘণ্টা তাঁকে আটকে রাখা হয়েছিল।
মমতার অভিযোগের নিশানায় সরাসরি বিজেপি। তাঁর দাবি, বিজেপির লোকজন জড়ো করেই এই বিক্ষোভ করানো হয়েছে। যে কর্মীর মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি যাচ্ছিলেন, সেই ঘটনায় প্রকৃত অভিযুক্ত এখনও বাইরে রয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। মমতার কথায়, “আমি বেরবই। বিজেপি ভয় পায় আমায়। এই ভাবে আমায় আটকাতে পারবে না।” তাঁর বক্তব্য, ভয় দেখিয়ে তাঁকে থামানো যাবে না।
বিজেপির পাল্টা বক্তব্য অবশ্য সম্পূর্ণ অন্য। দলের বিধায়ক অর্জুন সিংয়ের দাবি, এত দিনের শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ থেকেই এই প্রতিক্রিয়া। মমতাকে আক্রমণ করে তাঁর কটাক্ষ, “চোরকে তো চোরই বলবে।” ফলে রবিবারের ঘটনা দ্রুতই পরিণত হয়েছে তৃণমূল-বিজেপির নতুন রাজনৈতিক সংঘাতে।
তবে এর আগে ৩০ মে সোনারপুরের ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দলীয় কর্মীর বাড়িতে যাওয়ার পথে অভিষেকের কনভয় ঘিরে বিক্ষোভ হয়েছিল। তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে নিরাপত্তারক্ষীদের তৎপরতায় তাঁকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই ঘটনায় অভিষেককে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছিল গোটা রাজ্যে। আর ৭১ দিন পর মমতার ক্ষেত্রে ‘চোর’ স্লোগান, জুতো ও ইট ছোড়ার অভিযোগ—দুটি ঘটনা যেন একই রাজনৈতিক আবহের দুই ছবি।
এর মধ্যে বদলে গিয়েছে বাংলার ক্ষমতার সমীকরণ। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। মমতা এখন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। যে প্রশাসনিক ক্ষমতা এত দিন তৃণমূলের রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল, তা এখন তাদের হাতে নেই। ফলে ময়দানের রাজনীতিতেও বদল এসেছে।
তার অভিঘাত পড়ছে তৃণমূলের অন্দরেও। ক্ষমতা হারানোর পর একাধিক নেতা-কর্মীর অবস্থান বদল, স্থানীয় স্তরে সংগঠনের টানাপড়েন এবং নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের দিকে রাজনৈতিক সরে যাওয়ার আলোচনা চলছে। এত দিন ক্ষমতার ছায়ায় থাকা সংগঠনকে এখন বিরোধী রাজনীতির বাস্তবতায় নিজেদের অস্তিত্ব ও কর্মী-সমর্থকদের ধরে রাখার লড়াই করতে হচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক প্রতিবাদ আর শারীরিক হেনস্থার সীমারেখা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মতের বিরোধিতা, স্লোগান বা বিক্ষোভ গণতান্ত্রিক রাজনীতির অঙ্গ হতে পারে। কিন্তু ইট, জুতো বা হামলার অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদের মধ্যে আটকে থাকে না, আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নও সামনে আসে।
তৃণমূলের অভিযোগ, ক্ষমতা বদলের পর তাদের নেতাদের নিশানা করে পরিকল্পিত অপমান ও আক্রমণের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। বিজেপির বক্তব্য, দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভই এখন প্রকাশ্যে আসছে। কিন্তু ৩০ মে সোনারপুর থেকে ৯ অগস্টের রবিবার—দুই ঘটনার মাঝের ৭১ দিন বাংলার রাজনীতির বদলে যাওয়া ভাষাটা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
এক জন উত্তরসূরি, অন্য জন নেত্রী। এক বার ডিম, এক বার জুতো-ইট। আর তার সঙ্গে ‘চোর’ স্লোগান। প্রশ্ন তাই শুধু তৃণমূলের ক্ষমতাচ্যুতি নয়—ক্ষমতা হারানোর পর বাংলার রাজপথে যে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, তার পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?