কার্গিল যুদ্ধের ইতিহাসে ভারতীয় সেনার বীরত্বের কথা বহুবার উঠে এসেছে। টাইগার হিল পুনর্দখল, টোলোলিংয়ের লড়াই কিংবা ‘অপারেশন বিজয়’— প্রতিটি অধ্যায়ই আজ ইতিহাস। কিন্তু সেই যুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্দার আড়ালের গল্প এতদিন কার্যত অজানাই ছিল। যুদ্ধের উত্তাল দিনগুলিতে যখন পাকিস্তানি সেনা ও অনুপ্রবেশকারীরা দুর্গম পাহাড়চূড়ায় ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল, তখন ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে এমন একটি প্রযুক্তি তুলে দিয়েছিল ইজরায়েল, যা গোটা যুদ্ধের সমীকরণই বদলে দেয়। প্রায় ২৭ বছর পরে সেই গোপন সহযোগিতার কথা প্রকাশ্যে এনেছেন অভিযানের সঙ্গে যুক্ত দুই প্রাক্তন ইজরায়েলি বায়ুসেনা আধিকারিক।
সংবাদ সংস্থা সূত্রের খবর, ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় বায়ুসেনার মিরাজ–২০০০ যুদ্ধবিমানকে অত্যাধুনিক লাইটেনিং (Litening) টার্গেটিং পড দিয়ে দ্রুত যুদ্ধোপযোগী করে তুলতে ইজরায়েল নীরবে বিশেষজ্ঞদের একটি দল ভারতে পাঠিয়েছিল। সেই সময় ভারত-ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখনও আজকের মতো প্রকাশ্য বা বিস্তৃত ছিল না। ফলে গোটা অভিযানই চালানো হয়েছিল অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে।
রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের প্রাক্তন প্রোগ্রাম ম্যানেজার 'অ্যামি' এবং ইজরায়েলি বায়ুসেনার প্রাক্তন মিরাজ স্কোয়াড্রন কমান্ডার 'শ্লোমো'র দাবি, সেই সময় পরিস্থিতি এতটাই স্পর্শকাতর ছিল যে, এই অভিযানের কথা প্রকাশ্যে আনা হয়নি। দুই দেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই সবকিছু গোপন রাখা হয়েছিল।
যুদ্ধের আগেই শুরু হয়েছিল প্রস্তুতি
এই সহযোগিতার ভিত্তি অবশ্য কার্গিল যুদ্ধের অনেক আগেই তৈরি হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের নভেম্বরে ভারত সিদ্ধান্ত নেয়, ফরাসি নির্মিত মিরাজ–২০০০ যুদ্ধবিমানে ইজরায়েলের তৈরি লাইটেনিং টার্গেটিং পড সংযুক্ত করা হবে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবিমান বহু দূরের লক্ষ্যবস্তুকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে এবং লেজার-নির্দেশিত বোমা দিয়ে নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম হয়।
১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সালের মার্চ পর্যন্ত ডিআরডিও, হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (HAL), ভারতীয় বায়ুসেনা এবং ইজরায়েলি বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে এই প্রকল্পে কাজ করছিলেন। কিন্তু সেই প্রকল্প পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায় কার্গিল সংঘাত।
এক ফোন, তারপর রাতারাতি ভারতে ইজরায়েলি বিশেষজ্ঞরা
কার্গিলে যুদ্ধের পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতেই তৎকালীন ভারতীয় প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এন. এ. কে. ব্রাউন— যিনি পরে ভারতীয় বায়ুসেনার প্রধান হন— ইজরায়েলের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগ করেন। রাতে সেই ফোন পাওয়ার পর আর দেরি করেননি ইজরায়েলি বিশেষজ্ঞরা।
রাফায়েলের প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ এবং বায়ুসেনার অভিজ্ঞ সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ দল প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ দ্রুত ভারতে পৌঁছে যায়। তাঁদের ধারণা ছিল, কয়েকটি প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান করলেই কাজ শেষ হবে। কিন্তু ভারতে এসে তাঁরা বুঝতে পারেন, যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি কঠিন। এরপর দিন-রাত এক করে ভারতীয় বায়ুসেনার সঙ্গে কাজ করে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মিরাজ–২০০০-কে পূর্ণ যুদ্ধক্ষম করে তোলেন তাঁরা।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই প্রযুক্তি?
কার্গিল যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান। তারা পাহাড়ের অনেক উঁচু চূড়ায় বাঙ্কার তৈরি করেছিল। নিচ থেকে সেই লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব ছিল। আবার খুব নিচু দিয়ে উড়ে হামলা চালালে পাকিস্তানের কাঁধে বহনযোগ্য স্টিঙ্গার ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে ভারতীয় বিমান বিপদের মুখে পড়ছিল।
এই পরিস্থিতিতে লাইটেনিং টার্গেটিং পড যুক্ত মিরাজ–২০০০ যুদ্ধবিমান নিরাপদ উচ্চতা বজায় রেখেই অত্যন্ত নির্ভুলভাবে শত্রুর অবস্থান চিহ্নিত করে লেজার-নির্দেশিত বোমা ফেলতে সক্ষম হয়। এর ফলে পাকিস্তানের বাঙ্কার, গোলাবারুদের ভাণ্ডার, সরবরাহ লাইন এবং কৌশলগত ঘাঁটিগুলিতে একের পর এক সফল আঘাত হানা সম্ভব হয়।
বদলে যায় যুদ্ধের মোড়
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মিরাজ–২০০০-এর এই নির্ভুল হামলাই কার্গিল যুদ্ধে ভারতের অন্যতম বড় কৌশলগত সাফল্য এনে দেয়। টাইগার হিল, মুন্সো ঢালো-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পাকিস্তানের অবস্থান দুর্বল করে দেয় ভারতীয় বায়ুসেনা। স্থলবাহিনীর অগ্রযাত্রাও অনেক সহজ হয়ে যায়।
অপারেশন বিজয়ের সময় ভারতীয় বায়ুসেনা প্রথমবার এত বড় পরিসরে নির্ভুল লেজার-গাইডেড বোমা ব্যবহার করে। সেই প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পেছনে ইজরায়েলের সহযোগিতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই দাবি করেছেন প্রাক্তন ইজরায়েলি আধিকারিকরা।
কার্গিলের পর আরও ঘনিষ্ঠ দুই দেশ
কার্গিল যুদ্ধের সেই গোপন সহযোগিতা শুধু যুদ্ধ জেতাতেই সাহায্য করেনি, ভারত-ইজরায়েল প্রতিরক্ষা সম্পর্কেরও নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন, রাডার, নজরদারি প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থায় সহযোগিতা দ্রুত বাড়তে থাকে।
বর্তমানে ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা অংশীদার ইজরায়েল। বারাক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নত সেনা প্রযুক্তিতে দুই দেশের যৌথ কাজ আন্তর্জাতিক মহলেও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
২৭ বছর পর কেন প্রকাশ্যে এল এই তথ্য?
সংবাদ সংস্থা সূত্রের খবর, এতদিন নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক কারণে এই অভিযানের বহু তথ্য প্রকাশ্যে আনা হয়নি। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এখন সেই গোপন অধ্যায়ের অনেকটাই সামনে এসেছে। প্রাক্তন ইজরায়েলি আধিকারিকদের বক্তব্য, কার্গিলে তাঁদের ভূমিকা ছিল শুধুই প্রযুক্তি সরবরাহ নয়; যুদ্ধের সবচেয়ে সংকটজনক সময়ে ভারতীয় বায়ুসেনার পাশে দাঁড়ানোও ছিল তাঁদের দায়িত্ব।
কার্গিল যুদ্ধের ইতিহাসে ভারতীয় সেনা ও বায়ুসেনার বীরত্ব চিরস্মরণীয়। তবে ২৭ বছর পরে সামনে আসা এই তথ্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রে সাহসের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত সহযোগিতাও ভারতের জয়ের অন্যতম ভিত্তি ছিল। আর সেই নীরব সহযোগিতার অন্যতম নাম— ইজরায়েল।