নয়াদিল্লি, নিউজ ডেস্ক : মাঝ আকাশে আচমকাই বিমান নামতে শুরু করেছে নীচের দিকে। ককপিটের সামনে যাত্রীদের ছোটাছুটি। কেউ চিৎকার করে বলছেন, ‘‘ও বিমানটিকে ভেঙে ফেলতে চাইছিল!’’ কেউ আবার চিকিৎসক খুঁজছেন। তারই মধ্যে মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ভারতীয় পাইলট। কাঁপা গলায় বলছেন, ‘‘ও আমাকে বার বার মেরেছে।’’ ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে মাঝ আকাশের সেই আতঙ্কের নতুন ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসতেই ঘটনার ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আভিভ যাচ্ছিল ফ্লাইদুবাইয়ের Boeing 737 MAX 8 বিমানটি। বিমানে ছিলেন ১৭০-রও বেশি যাত্রী। যাত্রাপথে ককপিটে ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের সঙ্গে তাঁর সহ-পাইলটের আচমকা সংঘর্ষ শুরু হয় বলে তদন্তকারীদের প্রাথমিক তথ্য। অভিযোগ, সহ-পাইলট ক্যাপ্টেনকে আক্রমণ করার পর বিমানটি দ্রুত নীচে নামতে শুরু করে। প্রায় ৩০ সেকেন্ডে বিমানটি ১৪ হাজার ফুটেরও বেশি নেমে যায় বলে রয়টার্সের যাচাই করা তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে উঠে এসেছে।
নতুন ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, ঘটনার পর বিমানের ভিতর কার্যত হুলস্থুল পরিস্থিতি। যাত্রী ও বিমানকর্মীরা ককপিটের দিকে ছুটে যাচ্ছেন। কেউ আহত পাইলটের জন্য চিকিৎসক চাইছেন। কেউ আবার আক্রমণকারী সহ-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন। ভিডিয়োর এক পর্যায়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায় ক্যাপ্টেন মচ্ছরকে। তাঁর শরীরের একাধিক জায়গায় আঘাতের চিহ্ন। তিনি বলতে শোনা যায়, ‘‘ও আমাকে বার বার মেরেছে।’’ পরে নিজের হাতের দিকে ইঙ্গিত করে জানান, হাত নাড়াতে পারলেও মুঠো করতে পারছেন না।
তত ক্ষণে বিমানের ভিতরে যাত্রীদের একাংশ বুঝে গিয়েছেন, পরিস্থিতি সাধারণ কোনও গোলমাল নয়। ভিডিয়োয় এক যাত্রীকে বলতে শোনা যায়, সহ-পাইলট বিমানটিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল। আর এক জন বার বার সবাইকে শান্ত থাকতে বলেন। ককপিটের কাছে থাকা যাত্রীদের দ্রুত ভিতরে ঢোকার নির্দেশও দেওয়া হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি এসেছিল আহত ক্যাপ্টেন মচ্ছরের কাছ থেকেই। গুরুতর জখম হওয়া সত্ত্বেও তিনি ককপিটের দরজা খোলার ব্যবস্থা করেন। দরজা খুলতেই কয়েক জন যাত্রী এবং বিমানকর্মী ভিতরে ঢুকে পড়েন। এক যাত্রী পিছন থেকে সহ-পাইলটকে ধরে ফেলেন। পরে অন্যরা তাঁকে মাটিতে ফেলে নিয়ন্ত্রণে আনেন। মাথার উপরে তখনও বিমানের নিয়ন্ত্রণ সামলানোর মরিয়া চেষ্টা চলছে।
সহ-পাইলটকে শেষ পর্যন্ত হেডফোনের তার দিয়ে বেঁধে ফেলা হয় বলে এক যাত্রী জানিয়েছেন। জভিকা মানেস নামে ওই যাত্রী জানান, তিনি এবং আরও কয়েক জন মিলে সহ-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। আহত ক্যাপ্টেন তখনও সচেতন ছিলেন এবং যোগাযোগ করতে পারছিলেন বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এর পর বিমানের দায়িত্ব নেয় বিমানে থাকা রিজার্ভ ফ্লাইদুবাই ক্রু। বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। আহত ক্যাপ্টেন মচ্ছরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
তাবুকে অবতরণের পরেও বিমানের ভিতরের উত্তেজনা পুরোপুরি কাটেনি। ভিডিয়োয় দেখা যায়, সহ-পাইলটকে হাত পিছনে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার আগে পর্যন্ত কেউ যাতে কাছে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করছিলেন যাত্রীরা। অন্য দিকে আহত মচ্ছরকে স্ট্রেচারে করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনার কারণ এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদী হামলা হিসেবে দেখছে। অন্য দিকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে, এই ঘটনার সঙ্গে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বা পূর্বপরিকল্পনার কোনও যোগ ছিল কি না। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হয়নি। ফ্লাইদুবাইও দ্রুত কোনও সিদ্ধান্তে না পৌঁছনোর বিষয়ে সতর্ক করেছে।
অন্য একটি প্রশ্ন ঘিরেও তদন্ত চলছে—আক্রমণে ঠিক কোন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। যাত্রীদের একাংশ ছুরির মতো অস্ত্র দেখার কথা জানিয়েছেন। আবার ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কুঠার ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। তবে কোন অস্ত্র ব্যবহার হয়েছিল, তা এখনও স্বাধীন ভাবে নিশ্চিত হয়নি।
মাঝ আকাশে ককপিটের দরজা বন্ধ। ভিতরে দুই পাইলটের একজন আহত, অন্য জনের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বিমান হাজার হাজার ফুট নীচে নেমে যাচ্ছে। আর সেই পরিস্থিতিতে নিজের গুরুতর আঘাতের মধ্যেও দরজা খুলে সাহায্যের সুযোগ করে দিলেন ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। নতুন ভিডিয়োর কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্যই এখন গোটা ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
