পূর্ব মেদিনীপুর, নিউজ ডেস্ক: এলাকার মানুষ তখনও ঘুমের ঘোরে। ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। আচমকায় কয়েকটি গাড়ি এসে থামে একটি বাড়ির আশেপাশে। এবং মুহূর্তের মধ্যেই চারিদিক ঘিরে ফেলে পুলিশকর্মীরা। এরপর বাড়িটির ভিতর থেকে যাকে বের করে আনা হল, তাঁর পরিচয় জানার পর বদলে গেল গোটা ঘটনার গুরুত্ব। বহু বছর ধরে জঙ্গল ও সীমান্ত এলাকায় আত্মগোপনে থাকা এক ব্যক্তির খোঁজ শেষপর্যন্ত লোকালয়ের একটি বাড়িতে মিলল। আর তারপরেই সামনে এল বহু বছরের পুরনো এক কাহিনী।
পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরের মনিনাথপুরে শ্বশুরবাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে শীর্ষ মাওবাদী নেতা অসীম মন্ডলকে ওরফে 'আকাশ'কে। কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বা STF এবং ঝাড়খণ্ড পুলিশের যৌথ অভিযানে বৃহস্পতিবার ভোরে এই গ্রেফতারি হয় বলে জানা গিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছিল বলে পুলিশ সূত্রে দাবি। সূত্রের খবর, সম্প্রতি মাওবাদী সংগঠনের একাধিক ঘাঁটিতে অভিযানের পর আকাশের পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাঁর দলের কয়েকজন সদস্য ধরা পড়েন এবং দলের সঙ্গে থাকা অর্থ পুলিশের হেফাজতে চলে যায়। কার্যত অর্থসংকটে পড়ে তিনি কিছু টাকার ব্যবস্থা করতে পটাশপুরে নিজের শ্বশুর বাড়িতে এসেছিলেন বলে অনুমান করা হয়। আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তাতে রাজি ছিলেন না বলেও জানা গিয়েছে।
পুলিশের নজর অবশ্য আগের থেকেই ছিল ওই বাড়ির উপরে। আকাশ সেখানে পৌঁছনোর খবর পাওয়ার পরে অভিযান চালানো হয়। বৃহস্পতিবার ভোর প্রায় তিনটে নাগাদ তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়। তাঁর কাছ থেকে মাওবাদী সংগঠনের বেশ কিছু বই এবং নথিপত্র উদ্ধার হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অসীম মন্ডলের মাওবাদী রাজনীতিতে প্রবেশ অবশ্য বহু পুরনো। পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনার ফুলচক গ্রামের বাসিন্দা তিনি। আশির দশকে কলেজ জীবন থেকেই বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি বলে। পরবর্তীকালে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং জঙ্গলমহলের বিভিন্ন এলাকায় সংগঠনের কাজে যুক্ত হন। ২০০৪ সালে সিপিআই তৈরি হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খন্ডে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
লালগড় আন্দোলনের সময়ও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে জানা গিয়েছে। ২০১০ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক হন তিনি। ২০১১ সালে কিষেনজির মৃত্যুর পর রাজ্যে মাওবাদী সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে তাঁর ভূমিকা আরও বেড়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের তালিকায় থাকা এই নেতার বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ড ও ওড়িশায় প্রায় ৫৫ টি গুরুতর মামলা রয়েছে বলে সূত্রে খবর। এমনকি, তাঁর সন্ধান দিতে ঝাড়খন্ডে এক কোটি এবং ওড়িশায় এক কোটি ২০ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করাও হয়েছিল। দীর্ঘ বছরের আত্মগোপনের পর এবার সেই মাওবাদী নেতা পুলিশের হাতে। পটাশপুরের একটি বাড়িতে ভোরের অভিযানে শেষ হল এত বছরের লুকোচুরি খেলা। তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া নথি এবং সামগ্রী ঘিরে নতুন কি তথ্য সামনে আসে, এখন সেদিকেই নজর তদন্তকারীদের।