নিউজ ডেস্ক: “চাঁদের পাহাড়“, “পথের পাঁচালী”র মতো উপন্যাস লিখে বাংলাকে গোটা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন বিভূতীভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় । অথচ তাকে শিক্ষকতার চাকরি থেকে বিতারিত হতে হয়েছিল এক অদ্ভুত কারণে।
হুগলির জাঙ্গীপাড়া দ্বারকানাথ হাইস্কুলে লেখক তখন শিক্ষকতা করেন। কিছু দিন আগেই তাঁর স্ত্রী গৌরী দেবী ওলাওঠো (কলেরা) রোগে মারা গিয়েছেন। মাঝে মাঝেই তিনি স্ত্রীর উদ্দেশে প্ল্যানচেট করতেন। সে সময় স্কুলের অস্থায়ী প্রধান শিক্ষক বৃন্দাবন সিংহরায় শিক্ষকতা ছেড়ে ওকালতি পেশায় ফিরতে চাইছিলেন। তার ইচ্ছা ছিলো বন্ধু ও ছাত্রদরদি শিক্ষক বিভূতিভূষণ ওই পদে বসুক।
অন্যদিকে বিএ পাশ বিভূতিভূষণের বদলে ওই গ্রামের সদ্য এমএ পাশ করা রাজকুমারকে তার একদল অনুগামী ওই পদে বসাতে চাইলেন। বিভূতিভূষণকে সরাতে তাঁর প্ল্যানচেট করাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হল। শ্রীরামপুরের সাব-ডিভিশনাল অফিসারকে জানানো হল একজন স্কুলশিক্ষক ভূত-প্রেত নিয়ে খেলা করেন। এসডিও সাহেব তদন্ত শুরু করলেন।
ভারাক্রান্ত মনে বিভূতিভূষণ কলকাতায় ফিরে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সুপারিশে ফের শিক্ষকতার চাকরি পেলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনায় হরিনাভি অ্যাংলো সংস্কৃত স্কুলে। ঐ গ্রামেরই এক গৃহবধূ নিভাননী লেখককে নিজের ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। হরিনাভি থাকার সময় বিভূতিভূষণের মাতৃবিয়োগ ঘটলে সেই স্নেহ আরও বেড়ে যায়। কিন্তু গ্রামের মানুষের সংকীর্ণতা বিভূতিভূষণের জন্য এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে।
হরিনাভিতে থাকাকালীনই ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় বিভূতিভূষণের ‘উপেক্ষিতা’ নামে একটি গল্প প্রকাশিত হয়। সেই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিল নিভাননীর ছায়া। গ্রামে গুঞ্জন শুরু হয়, মাস্টার গ্রামের বউকে নিয়ে কাগজে কেচ্ছা ছাপাচ্ছেন। এর পর একই পত্রিকায় ‘উমারাণী’ নামে আরেকটি গল্প ছাপা হলে গ্রামে রটে যায় ওই গল্প নাকি নিভাননীর মেয়ে অন্নপূর্ণাকে নিয়ে লেখা। লোকে বলতে শুরু করে যে, শুধু বউ নয়, গাঁয়ের কমবয়সি মেয়েদের নিয়েও মাস্টার কেচ্ছা চালাচ্ছেন। এর পর বিভূতিভূষণ একটি ইস্তফাপত্র লিখে স্কুল ছুটির পর তা তুলে দেন হেডস্যারের হাতে।
কোনও অনুরোধেই আর বিভূতিভূষণকে আটকে রাখা যায়নি। চাকরিজীবন শুরু করেছিলেন শিক্ষকতা দিয়ে। কিন্তু পর পর দুটি জেলার দুটি স্কুলে বিভূতিভূষণ জীবনে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তাতে গ্রামের সমাজজীবন সম্পর্কে তাঁর ঘেন্না-বিদ্বেষ জন্মানোরই কথা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তা হয়নি, বরং গ্রাম্যজীবনকে তিনি বার বার প্রাধান্য দিয়েছেন তাঁর লেখায়। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন— মানুষের পৃথিবী, ফুটপাথ আর দেওয়ালে শেষ হয় না!
পরে তিনি গোরক্ষিণী সভার কাজে পূর্ববঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা, আরাকান ঘোরেন; তারপর খেলাতচন্দ্র ঘোষের উত্তর বিহারের এস্টেট দেখাশোনা করতে ভাগলপুর যান। একজন লেখকের জন্য অদ্ভুত চাকরি হলেও দূরে পাহাড়, জঙ্গল আর বিস্তীর্ণ প্রান্তর ঘেরা পরিবেশ বিভূতিভূষণকে কল্পনাপ্রবণ করে তুলতো। তিনি ‘বিচিত্রা’য় ধারাবাহিক ভাবে লিখতে লাগলেন ‘পথের পাঁচালী’।
প্রিয়তমা স্ত্রীকে প্ল্যানচেট করার দায়ে স্কুল এবং গ্রামে অপমানিত হয়ে বিতাড়িত হয়েছেন অথচ বিভূতিভূষণের সাহিত্যে যত শ্রেষ্ঠ চরিত্র তারা সবাই গ্রাম্য জীবনেরই মানুষ। সেগুলির অনেকের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ও আছে! অপু-দুর্গার মতো কলজয়ী চরিত্র আমাদের অনেকেরই হৃদয়ের খুব কাছের। সারল্য এবং নির্মমতা, নীরবতা ও সহনশীলতার মধ্য দিয়েও পৃথিবীর গণ্ডিগুলো যে বারবার ভাঙতে চেয়েছিলেন বিভূতিভূষণ, তা তার লেখায় স্পষ্ট।