নিউজ ডেস্ক: লোকসংস্কৃতি ও কৃষিভিত্তিক সমাজের চিহ্ন বহন করে আজও বাংলার গ্রামে পালিত হয় ‘ভাঁজো’। ভূমির উর্বরতা তথা শস্য কামনা এবং নারীর প্রজনন ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে এই ব্রত। শস্যবীজের মান পরীক্ষার জন্য এক সময়ে গ্রামবাংলায় এই ব্রতকথা পাঠ হতো। এখন কৃষিক্ষেত্রে বদল এসেছে। প্রযুক্তির বাড়বাড়ন্তে শস্যবীজের মান পরীক্ষা খুব একটা কঠিন নয়। উন্নত প্রজাতির উচ্চফলনশীল বীজ এখন বাজারে ভর্তি। তবুও বর্ধমান, বীরভূম এবং মুর্শিদাবাদের অন্ত্যজ শ্রেনীর মানুষের নিরাসক্ত জীবনে কিঞ্চিত আনন্দের উৎস এই লৌকিক উৎসব। কুমারী মেয়েদের উদযাপিত ভাঁজোকে বলে 'ছোটো ভাঁজুই' এবং বিবাহিত মহিলাদের উদযাপিত ভাঁজোকে বলে 'বড়ো ভাঁজুই'।
লোকশ্রুতি অনুসারে, ভাঁজো হলেন ইন্দ্রের অপ্সরী ভঞ্জিকা। তিনি নৃত্য বিলাসিনী। সেই সূত্রেই ‘ভঞ্জিকা’ থেকে ভাঁজো কথাটি এসেছে বলে মনে করা হয়। সাধারণত ভাঁজোর কোনো মূর্তিপূজা হয়না। মাছধরার ‘পোলুই’, বাঁশের বাতা ও কাপড় দিয়ে উপাস্য দেবতা রূপ পায়। নানা ধরনের ফুল দিয়ে সাজানো হয়। কিন্তু ভাঁজো-তে লোকপুরাণের পাঠের পরিবর্তে সারা রাত আদিরসাত্মক ছড়া কাটাকাটিই হয়ে ওঠে মুখ্য আকর্ষণ। যেমন-
“ভাদদ মাসে আসেন ভাঁজো আসেন বাপের বাড়ি।
মনমরা নয় মনমরা নয় বড়ই যে আদুরী।।
দুয়ারে আলপনার ছটা ঘরে ভাঁজোর সরা।
বাপের বাড়ি আসেন ভাঁজো ঝলমল ঝলমল করা।।
এসো ভাঁজো বোসো ভাঁজো এই পিঁড়িতে বোসো।
আদরে পূজিব ভাঁজো মুখ তুলে গো হেসো"।।
তবে আসল উৎসব শুরু হয় রাতে। সেই সময় ছড়ায় অশ্লীল গালাগালি-বাচক শব্দের বাহুল্য দেখা যায়। যেমন–
“মাঙের গাঙে বাঙ (বান) এসেছে চ্যাং ছিঙুরির টানে।
(তোকে) ঢেমনি বলে এমনি এমনি, ছুটিস নাঙের পানে।।’
অজস্র অশ্লীল যৌনগন্ধী শব্দের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল যৌনাঙ্গ ও সংশ্লিষ্ট নারী-পুরুষ সম্পর্কের রসায়নমূলক কথা। আমাদের কাছে এসব ছড়া অশ্লীল বলে মনে হলেও, যাঁরা ভাঁজোর পুজো করেন– তাঁদের কাছে মন্ত্র স্বরূপ। তাঁরা বিশ্বাস করেন, এই ছড়া কাটাকাটি শুনতে ভাঁজো ভালোবাসেন এবং এর ফলে জমিতে ফলন হবে উত্তম। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, মহিলাদের প্রজনন ক্ষমতা এবং প্রকৃতির উৎপাদন ক্ষমতা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
দেবী দুর্গাও তার ব্যতিক্রম নন। ভাঁজোকে ‘দুর্গার বড়দিদি’ বলে লোকসমাজে। ভাঁজোর মতো দুর্গাপুজোতেও একসময় আদিরসাত্মক নাচ-গান, অশ্লীল ভঙ্গির প্রচলন ছিল। তার নাম ‘শাবোরৎসব’। কালিকাপুরাণ রঘুনন্দনের তিথিতত্ত্বে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। উনিশ-বিশ শতকে অনেক বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোয় নবমীর রাতে দেবীর সম্মুখে আদিরসাত্মক খেউড় গান করা বিধিবদ্ধ রীতি ছিল। তার নাম ছিল ‘নবমীর খেউড়’। ভাঁজো আসলে গ্রামীণ মহিলাদের একান্ত নিজস্ব অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। সেখানে কোনো অনাচারের স্থান নেই।