নিউজ ডেস্ক: সূর্যের অতীত নিয়ে এত দিন যে ছবিটা বিজ্ঞানীদের কাছে পরিচিত ছিল, তাতে এ বার ঢুকে পড়ছে এক অদৃশ্য গ্রহের গল্প! নতুন গবেষণার দাবি, সৌরজগতের একেবারে শুরুর দিকে, আজ থেকে কয়েকশো কোটি বছর আগে, তরুণ সূর্য হয়তো পৃথিবীর চেয়ে কয়েক গুণ ভারী একটি ‘সুপার-আর্থ’ গ্রাস করেছিল। সেই গ্রহের কিছু রাসায়নিক চিহ্ন এখনও সূর্যের গভীরে লুকিয়ে থাকতে পারে!
গবেষণাটি নেতৃত্ব দিয়েছেন তুরস্কের এজে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মুৎলু ইলদিজ। গবেষকদের মতে, সূর্যের বর্তমান গঠন ও অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে দীর্ঘদিনের কয়েকটি ধাঁধার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে এই সম্ভাবনা। তাঁদের মডেল বলছে, তরুণ সূর্যের দিকে একটি গ্রহ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে শেষ পর্যন্ত তার মধ্যে মিশে যেতে পারে। সবচেয়ে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে সেই গ্রহটির ভর ছিল পৃথিবীর প্রায় পাঁচ থেকে ১০ গুণ!
প্রশ্ন হল, এত বছর পর বিজ্ঞানীরা সেই হারিয়ে যাওয়া গ্রহের অস্তিত্বের কথা ভাবছেন কী ভাবে? আসলে সূর্যের ভিতরটাই এই রহস্যের সূত্র দিচ্ছে। সূর্যের অভ্যন্তরের গঠন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের হাতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ রয়েছে। হেলিওসিসমোলজি—অর্থাৎ সূর্যের ভিতর দিয়ে চলা কম্পন ও শব্দতরঙ্গের বিশ্লেষণ—থেকে তার অভ্যন্তরের বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু সূর্যের প্রচলিত মডেল দিয়ে সেই সমস্ত পর্যবেক্ষণ পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।
বিশেষ করে সূর্যের বাইরের স্তরে লিথিয়ামের অস্বাভাবিক ঘাটতি বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের মাথাব্যথা। পাশাপাশি সূর্যের ভিতরে শব্দের গতিবেগ, কনভেকশন জ়োনের গভীরতা এবং অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক গঠন নিয়েও কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। নতুন গবেষণায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে—এই সব সমস্যার পিছনে কি একই কোনও প্রাচীন ঘটনা কাজ করছে?
সেই সম্ভাবনাই পরীক্ষা করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের মডেল অনুযায়ী, সৌরজগতের শৈশবে গ্রহ তৈরি হওয়ার সময় চারপাশের গ্যাস ও ধুলোর ডিস্ক ছিল অত্যন্ত অস্থির। সেই পরিবেশে কোনও বড় গ্রহ তার কক্ষপথ হারিয়ে সূর্যের দিকে ক্রমশ এগিয়ে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত সূর্যের বাইরের স্তর অতিক্রম করে গ্রহটি নক্ষত্রের মধ্যে মিশে গেলে তার রাসায়নিক উপাদান সূর্যের অভ্যন্তরে একটি দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যেতে পারে। অর্থাৎ, গ্রহটি আজ আর নেই। কিন্তু তার ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ থেকে যেতে পারে সূর্যের ভিতরে।
গবেষকদের হিসাব বলছে, পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সবচেয়ে ভাল মেলে এমন পরিস্থিতিতে গ্রাস করা গ্রহটির ভর পৃথিবীর পাঁচ থেকে ১০ গুণ। এই ফলাফলই গবেষণার অন্যতম চমক। কারণ ‘সুপার-আর্থ’ ধরনের গ্রহ আমাদের গ্যালাক্সিতে বিরল নয়। অথচ সৌরজগতে পৃথিবী ও নেপচুনের মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যের এমন কোনও গ্রহ আজ নেই। আগের কিছু গবেষণাতেও সম্ভাবনা দেখানো হয়েছিল যে সৌরজগতের প্রথম দিকে বুধের কক্ষপথের ভিতরে কোনও সুপার-আর্থ তৈরি হয়ে পরে সূর্যের দিকে চলে যেতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা এটিকে এখনও চূড়ান্ত সত্য বলে ঘোষণা করছেন না। বরং এটি একটি শক্তিশালী সম্ভাবনা বা মডেল। সূর্য সত্যিই কোনও গ্রহকে গ্রাস করেছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্যও তাই—সূর্যের ভিতরে এমন কোনও রাসায়নিক বা কাঠামোগত ‘স্বাক্ষর’ খুঁজে বের করা, যা স্বাধীন ভাবে এই তত্ত্বকে সমর্থন করতে পারে।
আর যদি সেই প্রমাণ মেলে? তা হলে আমাদের সৌরজগতের শুরুর ইতিহাসটাই নতুন করে লিখতে হতে পারে। কারণ তখন সূর্য শুধু পৃথিবী-সহ গ্রহগুলির জন্মদাতা নয়—তার নিজের গঠনেও হয়তো এক হারিয়ে যাওয়া গ্রহের শেষ অধ্যায় মিশে রয়েছে। অর্থাৎ, আকাশে আজ যে সূর্যকে আমরা প্রতিদিন দেখি, তার বুকের গভীরে হয়তো এখনও ঘুমিয়ে রয়েছে কয়েকশো কোটি বছর আগের এক ‘সুপার-আর্থ’-এর স্মৃতি।