অঙ্কন দাস: ফার্সিতে তার নামের মানে সম্মানীয়া রাজকুমারী। আর বিয়ের পর তিনি হয়ে উঠলেন ভারত সম্রাজ্ঞী। বাবা ছিলেন মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শ্যালক। তার নাম আব্দুল হাসান আসাফ খান। তাঁরই মেয়ে 'আরজুমান্দ বানু'। কিন্তু সমগ্র ভারত তাকে চিনেছে তার স্বামীর দেওয়া ভালোবাসার নামে। সেই ভালোবাসার নাম মমতাজ-মহল। ছোট থেকেই রাজনীতির কোলে পিঠে বড় হয়েছেন তিনি। কূটনীতির হাত ধরাধরি করে খেলা করেছেন।
কিন্তু, সেই রাজনীতি তার জীবনে এনে দিল দিন বদলে দেওয়া মোড়। এ কথা বোধহয় ঘুণাক্ষরেও তিনি টের পাননি! মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিয়ে হল মুঘল সুলতানিয়াতের ভাবি সম্রাট, শাহজাদা খুররমের সঙ্গে। শাহাজাদা খুররম, লোকে যাকে ভবিষ্যতে চিনবে শাহজাহান নামে। ভারত সম্রাট শাহজাহান। মুঘল সাম্রাজ্যের সবথেকে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র শাহজাহান। সম্রাট শাহজাহানের মমতাজ মহলকে নিয়ে মোট তিনজন স্ত্রী ছিলেন। এছাড়াও ১১ জন উপপত্নী ছিলেন।
দিনটা ছিল ১০ই মে, ১৬১২। এই দিনই চার চোখ এক হলো খুররম এবং আরজুমান্দ বানু'র। একসময় সিংহাসনে বসলেন খুররম, উপাধি নিলেন শাহজাহান। শাহজাহান অর্থাৎ দুনিয়ার সম্রাট। মাত্র ১৯বছর বয়সেই বিয়ে হয়েছিল আরজুমান্দ বানু'র। দীর্ঘ ১৯ বছরের বিবাহিত জীবন। আর তাতেই মোট ১৪টি সন্তানের জননী হলেন তিনি। সাতটি সন্তান অকালেই মারা যায়। যে ক'জন বেঁচে ছিলেন তাদের মধ্যে বিখ্যাত হলেন দারা শিকো,শাহ সুজা, মুরাদ বক্স এবং ঔরঙ্গজেব।
মমতাজ মহল কে শাহজাহান কয়েকটি বিশেষ উপাধি প্রদান করেন। এই উপাধিগুলির মধ্যে পাদশাহি বেগম, মালিকা-এ-জাহান, মালিকা-এ-হিন্দুস্তান, মালিকা-এ-জামানি এগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মমতাজ মহল রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তথা রাজনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্রাট শাহজাহানের সবথেকে কাছের ছিলেন। আগেই যেমন জানানো হয়েছে, তিনি ছোট থেকেই রাজনীতি এবং কূটনীতির আঙিনায় খেলা করে বড় হয়েছিলেন। এই প্রবাদ ও প্রচলিত আছে যে ,যদি রাষ্ট্র পরিচালনার কোন সিদ্ধান্ত তার অপছন্দ হতো তবে তিনি সিংহাসনের পিছন থেকে সবার অগোচরে; সম্রাটের পিঠে হাত রেখে তা বুঝিয়ে দিতেন। এ কারণেই সম্রাট শাহজাহান মমতাজ মহলের হাতে দিয়েছিলেন শিলমোহর প্রয়োগের অধিকার। তার কাছে ছিল 'মোহর উজাহ্' নামে সেই বিশেষ ধরনের সিলমোহর।
সম্রাট শাহজাহান মমতাজ মহলকে পছন্দ শুধুমাত্র তার রাজনীতির জ্ঞানের জন্য করতেন না। মমতাজ মহলের মধ্যে এমন অনেক গুণ ছিল, যা সম্রাট শাহজাহানের অন্য পত্নীদের কাছে ছিল না; বা তারা সেই গুণগুলি সম্রাট শাহজাহানের কাছে প্রকাশ করতে পারেননি। এই বিশেষ গুণগুলির মধ্যে প্রথমেই যার কথা বলা হয় তা হল মাধুর্য। মমতাজ মহলের মাধুর্যে মুগ্ধ ছিলেন সম্রাট শাহজাহান। এছাড়াও মমতাজ মহলের আচরণ,দয়া, মহানুভবতা- এই কারণ গুলির জন্য সম্রাট শাহজাহান মমতাজ মহলকে তার প্রিয় পত্নী হিসেবে, এবং প্রধান পত্নী হিসেবে স্বীকার করেছিলেন। আর এ কারণে তখত- এ-তাউস, যাকে সাধারণ মানুষ চেনে ময়ূর সিংহাসন নামে;সেই 'সিংহাসন-পরামর্শদাত্রী' হিসেবে নাম রয়ে গেল মমতাজ মহলের।
আবার আসা যাক সেই পুরনো কথায়।রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে,পরামর্শদাত্রী হিসেবে, মমতাজ মহল তখন ধীরে ধীরে নিজের অধিকার কায়েম করে ফেলেছেন। এমনই একসময় দাক্ষিণাত্য অভিযানে বেরোলেন সম্রাট শাহজাহান। সেই সময়ে মমতাজ মহল তার ১৪তম সন্তানটিকে পৃথিবীর আলো দেখাতে চলেছেন। পূর্ণগর্ভা মমতাজ মহল দাক্ষিণাত্যের পথে চলছেন। এসে পৌঁছলেন বোরহানপুরে। সেখানেই গর্ভ যন্ত্রণা উঠল তার। এগিয়ে এলেন প্রশিক্ষিত ধাত্রী। সাহায্যের জন্য এলেন সেবা-শুশ্রষাকারীনির দল। কিন্তু ঘটনাটা ঘটলো এরপর। ১৪তম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে জীবন-মরণ সমস্যায় পড়লেন মমতাজ মহল। সামনে থাকা প্রসূতি এবং সেবা-শুশ্রষাকারিণীরা তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। শিশুটির জন্ম হল। কিন্তু প্রসবের পর অত্যাধিক রক্তক্ষরণে সম্রাট শাহজাহানের সব থেকে প্রিয় স্ত্রী প্রাণ ত্যাগ করলেন।
মমতাজ মহলের মৃত্যুর কারণ প্রসবসংক্রান্ত জটিলতা। এই ঘটনা নিয়ে অনন্ত কুমার তার মনুমেন্ট অব লাভ অ্যান্ড সিম্বল অব ম্যাটারনাল ডেথ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখেন 'মমতাজ মহলের ধারাবাহিক ও অত্যধিক গর্ভধারণ তার স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত এই পুনঃপুন গর্ভধারণের ফলেই তাকে প্রাণ হারাতে হয়।' সব থেকে বড় আশ্চর্যের কথা প্রথম ধাত্রীবিদ্যার জন্য চিন্তা ভাবনা তিনিই করেছিলেন। মমতাজ মহলের পরামর্শ অনুযায়ী, সম্রাট শাহজাহান প্রতিটি গ্রামে অন্ততপক্ষে একজন থেকে দুজন স্ত্রীকে ধাত্রীবিদ্যা শেখার জন্য চেষ্টা করতেন।
অথচ 'পোস্ট পার্টাম হেমারেজ' হওয়ায় ,যার ওপর কোন ধাত্রীবিদ্যা কাজ করল না-তিনি মমতাজ মহল। যখন অত্যাধিক রক্তপাত হচ্ছিল যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন মমতাজ মহল তখন তিনি কোথাও গিয়ে একটা কথা বুঝতে পেরেছিলেন। কথাটা হল ভালোবাসা আসলে অন্ধ'ই। আর তাই কাছে থাকা মেয়ে জাহানারা কে বলেন শাহজাহান কে ডেকে আনতে। মৃত্যুর আগে জেনে গেলেন তার একটি মেয়ে হয়েছে। পড়ে যার নাম রাখা হবে, 'গওহর বেগম' অর্থাৎ যার প্রচুর গয়না!
শাহজাহান এসো তো পৌঁছলেন কিন্তু তিনি এসে দেখলেন মমতাজ মহল তখন আর বেঁচে নেই! সমস্ত পৃথিবী যেন কালো হয়ে গেল ভারত সম্রাটের কাছে। ভেঙে পড়লেন তিনি। চোখ দিয়ে নেমে এলো অঝোর ধারায় জল। মমতাজ মহলের যন্ত্রণা কোথাও গিয়ে মিশে গেল সম্রাট শাহজাহানের সাথে। তার এই অবস্থা থেকে তাকে শেষ পর্যন্ত মুক্তি দিতে পেরেছিলেন জাহানারা। আর তাই জাহানারাকে পুরস্কৃত করেছিলেন সম্রাট শাহজাহান। মমতাজ মহল এর গচ্ছিত ১০ কোটি টাকার অর্ধাংশ দিলেন জাহানারাকে। এবং বাকি অর্ধাংশ ভাগ করে দিলেন তার বাকি সন্তানদের মধ্যে।
বুরহানপুরে তাপ্তি নদীর কিনারে মোগল শাহজাদা দানিয়ালের তৈরি একটি বাগান। সেই বাগানেই একটি নিভৃত কোনায় সমাধিস্থ করা হলো ভারত সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহল কে। কিন্তু বেশিদিন সেখানে রাখা হলো না শাহাজাদা দারা শিকো নিজে গিয়ে সেই বাগান থেকে তুলে নিয়ে এলেন তাঁর মা মমতাজ মহলের সমাধি।স্থাপন করলেন যমুনা তীরবর্তী একটি অঞ্চলে। আর তারপর তৈরি হল,পৃথিবীতে তৈরি হওয়া বিখ্যাত সমাধিক্ষেত্র 'তাজমহল'। সময়টা ১৬৩১ সালের ডিসেম্বর মাস।
এ এমনই সমাধি ক্ষেত্র যার,নিদর্শন অন্য কোথাও নেই। এই সমাধি ক্ষেত্র আসলে 'প্রেমের সমাধি ক্ষেত্র'। আর তাই পূর্ণিমার রাতে যখন চাঁদ ওঠে, চারিদিক আলোয় ভরে যায়, যমুনার জল তখন ছলাৎ ছলাৎ শব্দে গেয়ে যায় প্রেমের গান। তাজমহলের পাথরের গা থেকে ভেসে আসে মধুর সেই প্রেমগাঁথা। সেই প্রেম গাঁথা যে প্রেম কথা শুরু করেছিল আরজুমান্দ এবং খুররম ।আসলে ভালোবাসা বড় বিষম বস্তু। যা শেখায় ভালোবাসার জন্য নিজের জীবনও উৎসর্গ করা যায়!