কলকাতা: বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কারণ সব সময় কাজের খোঁজ নয়। কখনও নদী বাড়ি গিলে খায়, কখনও নোনা জলে চাষের জমি অনুর্বর হয়ে যায়, আবার কখনও ঘূর্ণিঝড়ের পরে ফিরে পাওয়ার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এত দিন এই মানুষগুলির ঠিকানা বদল ‘পরিযান’-এর সাধারণ পরিসংখ্যানেই হারিয়ে যেত। এবার সেই ছবিটাই বদলাতে চলেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঘরছাড়া মানুষকে আলাদা করে চিহ্নিত করবে জনগণনা।
সুন্দরবনের মৌসুনি, ঘোড়ামারা থেকে গঙ্গাভাঙনপ্রবণ মালদহ—পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নদী, সমুদ্র এবং ঘূর্ণিঝড়ের অভিঘাতে বছরের পর বছর ধরে বদলে যাচ্ছে মানুষের ঠিকানা। নতুন জনগণনার ৪০ প্রশ্নের তালিকায় চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, বিয়ে, জন্মের পরে স্থানান্তর বা পরিবারের সঙ্গে চলে যাওয়ার পাশাপাশি ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’-কেও পরিযানের কারণ হিসাবে রাখা হয়েছে। ফলে বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে যাঁরা ঘর ছেড়েছেন, তাঁদের একটি আলাদা পরিসংখ্যান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সবচেয়ে স্পষ্ট ছবি দক্ষিণ ২৪ পরগনার দ্বীপগুলিতে। ঘোড়ামারা দ্বীপের আয়তন ১৯৭২ সালে ছিল প্রায় ৭.২ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৬ বর্গকিলোমিটারে—পাঁচ দশকে অর্ধেক জমি সমুদ্রের গ্রাসে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩২ সালে দ্বীপটির আয়তন আরও কমে প্রায় ২.৬ বর্গকিলোমিটারে নেমে যেতে পারে বলে গবেষকদের অনুমান। সাগর দ্বীপের ক্ষেত্রেও গত এক শতকে জমি কমেছে—১৯২২ সালের প্রায় ২৫৬ বর্গকিলোমিটার থেকে বর্তমানে তা প্রায় ২৩০ বর্গকিলোমিটার।
এই বদলে যাওয়া ভূগোলের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনও। মৌসুনির ৫৫ বছরের মজেদ শাহ এক সময় দুই বিঘা জমির মালিক ছিলেন। সমুদ্র ধীরে ধীরে সেই জমি কমিয়েছে, শেষ পর্যন্ত একটি ঘূর্ণিঝড়ের পরে সেটুকুও হারিয়ে যায়। এখন ফ্রেজারগঞ্জে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় তাঁর পরিবারের। তাঁর আক্ষেপ, সরকারি নথিতে এখনও ঠিকানা মৌসুনি, অথচ বসবাসের বাস্তব ঠিকানা বদলে গিয়েছে।
ঘোড়ামারার কৃষক গোবিন্দ কারক পরিবার নিয়ে কাকদ্বীপের দিকে সরে গিয়েছেন। আর তপস কারক ঠাকুরপুকুরে শ্রমিকের কাজ করলেও পরিবারকে রেখেছেন নামখানায় আত্মীয়ের বাড়িতে। অর্থাৎ ভিটে হারানোর পরে শুধু মানুষ নয়, ভেঙে যাচ্ছে পরিবারের ভৌগোলিক কাঠামোও।
সেই একই গল্প গঙ্গার পাড়ের মালদহে। নদীর গতিপথ বদলাতে বদলাতে একের পর এক বসতি নিশ্চিহ্ন হয়েছে। মালদহের মানিকচকের সাহাবাতটোলার ৭১ বছরের মহম্মদ তাহের আলি নদীভাঙনের কারণে জীবনে তিন বার—১৯৬৬, ১৯৯৪ এবং ১৯৯৭ সালে—ঠিকানা বদলেছেন। নতুন জনগণনায় স্থান বদলের কারণ হিসেবে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ স্বীকৃতি পাওয়াকে তাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তিনি।
তবে জনগণনা কর্তাদের সতর্কবার্তাও রয়েছে। এই ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বিভাগকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিযানের পরিমাপ হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু এই তথ্য গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা খুলে দিতে পারে—দুর্যোগে সাময়িক ভাবে ঘরছাড়া মানুষ কত জন, আর তাঁদের কত জন শেষ পর্যন্ত আর নিজের ভিটেতে ফিরতে পারেন না।
সুন্দরবন থেকে মালদহ—এই জনগণনার খাতায় তাই শুধু ঠিকানা বদলের হিসাব নয়, উঠে আসতে পারে এক অন্য বাংলার ছবি। যেখানে মানুষ কাজের জন্য নয়, বাঁচার জন্য ঘর ছাড়ে।