নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: ইতিহাস কেবল রাজা-মহারাজা, যুদ্ধ-বিগ্রহ কিংবা সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের আখ্যান নয়; ইতিহাসের গভীরতম অধ্যায়গুলি অনেক সময় রচিত হয় নিভৃত পল্লির অখ্যাত মানুষের অদম্য সাধনা, আত্মত্যাগ ও স্বপ্নের ভিতর দিয়ে। শতাব্দীর কোলাহল পেরিয়ে সেইসব জীবন কখনও কখনও আমাদের সামনে ফিরে আসে বিস্ময়ের দীপ্তি নিয়ে। তেমনই এক বিস্মৃত অথচ গৌরবময় অধ্যায়ের নাম ফকির দাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে, ১৯২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। বাঁকুড়ার পাত্রসায়ের ব্লকের বামিরা গ্রামের এক সাধারণ মানুষ পাড়ি দিলেন সুদূর লন্ডনের উদ্দেশে, উচ্চশিক্ষার সাধনায়। সময়টা এমন, যখন ভারতবর্ষ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ, গ্রামবাংলায় শিক্ষার আলো অতি ক্ষীণ, আর সমাজের বহুস্তরে ‘কালাপানি’ পেরোনো নিয়ে ছিল প্রবল সংস্কার ও নিষেধের আবহ। সেই প্রতিকূলতার মধ্যেও এক দরিদ্র বিধবার সন্তান জ্ঞানের অন্বেষণে সমুদ্র পেরিয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে গেলেন। মাত্র দুই বছরের অধ্যবসায়ে অর্জন করলেন PhD ডিগ্রি। এই কাহিনি নিছক একজন ব্যক্তির সাফল্যের ইতিহাস নয়; এটি গ্রামবাংলার মাটি থেকে উঠে আসা এক অসামান্য মেধা, সংকল্প ও আত্মপ্রত্যয়ের দলিল।
ফকির দাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মকাহিনিও যেন এক আশ্চর্য লোককথার মতো। দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়ার পর এক ফকিরের আশীর্বাদে তাঁর জন্ম। তাই পিতা-মাতা স্নেহভরে তাঁর নাম রাখেন ‘ফকির দাস’। কিন্তু শৈশবেই পিতৃবিয়োগ। জীবনের শুরুতেই নেমে আসে অনিশ্চয়তার অন্ধকার। তবু মা ও দিদিমার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় সোনামুখীর বিদ্যালয়ে। ১৯০৯ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
আজকের দিনে যেখানে বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের হাতের নাগালে, এক শতাব্দী আগে বামিরা-পাত্রসায়ের অঞ্চলের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন এই বিস্তীর্ণ এলাকায় উচ্চশিক্ষার তো প্রশ্নই নেই, এমনকি বিদ্যালয়েরও ছিল অপ্রতুলতা। সেই প্রতিকূল পরিবেশ অতিক্রম করেই তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছিল কলকাতার পথে।
১৯১১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি IA পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। একই সময়ে তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন পরবর্তী কালের দুই বিশ্বখ্যাত ভারতীয় বিজ্ঞানী, মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু। এ তথ্যই তাঁর মেধা ও শিক্ষাগত পরিমণ্ডলের একটি উজ্জ্বল পরিচয় বহন করে।
পরবর্তী পর্যায়ে রিপন কলেজ থেকে দর্শন নিয়ে BA পাশ করেন। কিন্তু উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা তখনও তাঁর অন্তরে অম্লান। পরিবারের আর্থিক অনটন তাঁকে বাধ্য করেছিল কিছুদিনের জন্য শিক্ষকতার পেশায় প্রবেশ করতে। বর্ধমানের শাকারীতে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের সূচনা। পরে বাঁকুড়ার কুচিয়াকোল হাই স্কুলেও শিক্ষকতা করেন।
কিন্তু যাঁর অন্তরে জ্ঞানের জন্য এক দুর্নিবার তৃষ্ণা, তাঁকে সাময়িক চাকরির নিশ্চিন্ততা কতদিনই বা আটকে রাখতে পারে? তিনি শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে পুনরায় কলকাতায় ফিরে আসেন এবং MA-তে ভর্তি হন। অধ্যবসায় ও মেধার স্বাক্ষর রেখে সসম্মানে MA ডিগ্রি অর্জন করেন।
এরপর শুরু হয় তাঁর কর্মজীবনের আরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কুচবিহার কলেজে অধ্যাপনার সুযোগ পান। তৎকালীন কুচবিহার ছিল রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র। এখানেই তাঁর পরিচয় ঘটে বাংলার কিংবদন্তি শিক্ষাবিদ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই আশুতোষের স্নেহ ও আস্থার অধিকারী হন তিনি। পরবর্তীকালে স্যার আশুতোষের অনুরোধেই কলকাতা সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন।
ক্রমে তাঁর প্রতিভা ও কর্মদক্ষতা নজর কাড়ে তৎকালীন শিক্ষা প্রশাসনের। বাংলার শিক্ষা বিভাগে যোগ দেন তিনি। সেই সময়ের ডি.পি.আই ওটেন সাহেবের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর মেধা ও শিক্ষাক্ষেত্রে সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দিয়েই উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁকে বিলেতে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন, ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯২৫। এস. এস. রানাবাসু জাহাজে চেপে তিনি বিলাতের উদ্দেশে যাত্রা করেন। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর ২২ অক্টোবর তিনি লন্ডনে পৌঁছন। এক গ্রামবাংলার মানুষ, যার শৈশব কেটেছে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে, সেই মানুষই এবার দাঁড়ালেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্রের দ্বারে।
লন্ডনে তাঁর অধ্যয়ন ছিল অসাধারণ সাফল্যে পরিপূর্ণ। মাত্র দুই বছরের মধ্যে তিনি সসম্মানে PhD ডিগ্রি অর্জন করে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর এই সাফল্য নিছক ব্যক্তিগত কৃতিত্ব ছিল না; এটি ছিল সেই সময়ের গ্রামবাংলার শিক্ষাবঞ্চিত সমাজের পক্ষ থেকে জ্ঞানসভ্যতার কেন্দ্রে এক প্রতীকী পদচিহ্ন।
দেশে ফিরে শিক্ষা দফতরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বিশেষত শিক্ষক-শিক্ষণের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল স্মরণীয়। স্বাধীনতার পরও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠনে তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার মূল্য ছিল অপরিসীম। ১৯৪৯ সালে তিনি স্বাধীন ভারতের Deputy Director of Public Instruction পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবেই তাঁর কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরও ছিল বিস্ময়করভাবে সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো যুগপ্রতিভাদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিবাহের বরযাত্রী হয়েছিলেন এবং কবি মোহিতলাল মজুমদার ছিলেন বরকর্তা, যা তাঁর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের ব্যাপ্তির এক অনন্য পরিচয়। ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। তাঁর ছাত্রছাত্রী ও শুভানুধ্যায়ীদের পরিধিও ছিল বিস্তৃত।
তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় দিকগুলির একটি ছিল নিজের জন্মভূমির প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতা। শিক্ষার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেও তিনি নিজের গ্রামের কথা ভুলে যাননি। বালসী মিডল ইংলিশ স্কুলের উন্নয়নে তাঁর সক্রিয় সহযোগিতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রচেষ্টা ও সহায়তায় ১৯৪৮ সালে বিদ্যালয়টি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করে এবং উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। ১৯৫০ সালে এই বিদ্যালয় থেকেই ১৮ জন ছাত্র মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।
আমৃত্যু তিনি বালসী উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা সমিতির সভাপতি হিসেবে বিদ্যালয়ের অগ্রগতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ভগবতীচরণ দত্তের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, পাত্রসায়েরের জি. ডি. ইনস্টিটিউশনকে মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত করার ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
তাঁর পারিবারিক উত্তরাধিকারও শিক্ষার আলোয় উজ্জ্বল। তাঁর সন্তানরা উচ্চশিক্ষিত ছিলেন এবং শ্যামসুন্দর কলেজ ও বাঁকুড়া খ্রিস্টীয় কলেজের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর এক পুত্র চিকিৎসাশাস্ত্রে শিক্ষিত হয়ে আজীবন গ্রামের মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘পচাই ডাক্তার’ নামে; তাঁর ভালো নাম সুবিনয় ব্যানার্জি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, এমন এক মহৎ জীবন আজও আমাদের কাছে প্রায় বিস্মৃত। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তাঁর নাম যতটা উজ্জ্বল হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন ততটা দেখা যায় না। অথচ তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, জন্মপরিচয় কখনও মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; প্রতিকূলতা কখনও স্বপ্নের সমাধি রচনা করতে পারে না; আর জ্ঞানের প্রতি একনিষ্ঠ সাধনা থাকলে একটি প্রত্যন্ত গ্রামের সন্তানও বিশ্বের জ্ঞানভুবনে নিজের স্বাক্ষর রেখে আসতে পারেন।
শতবর্ষের প্রান্তে দাঁড়িয়ে তাই ফকির দাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুধু স্মরণ করাই যথেষ্ট নয়; তাঁর জীবন ও কর্মের আরও গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন। তাঁর অজানা অবদান, শিক্ষা-সংস্কারে তাঁর ভূমিকা, সমকালীন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, সবকিছুকেই নতুন করে অনুসন্ধান করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা দরকার।
কারণ, একটি গ্রামের ধূলিমাখা পথ থেকে লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যে যাত্রা, তা কেবল একজন মানুষের যাত্রা নয়, এ এক যুগের অন্ধকার ভেদ করে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক।
আজ তাঁর বিলেতযাত্রার শতবর্ষ। একশো বছর পরও সেই যাত্রার দীপ্তি ম্লান হয়নি। বরং সময়ের ধুলো সরিয়ে তাঁর জীবন আমাদের সামনে আজ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
হয়তো এই স্মরণই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি, যদি তাঁর জীবনকথা পড়ে বামিরা কিংবা বাংলার কোনও প্রত্যন্ত গ্রামের এক কিশোর-কিশোরী মনে মনে বলে ওঠে, “আমিও পারি।” সেই একটি বিশ্বাসই যদি জন্ম নেয়, তবে ফকির দাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের শতবর্ষ-পুরোনো আলোকযাত্রা আজও তার পথ চলা অব্যাহত রেখেছে, নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের ভিতর দিয়ে।