নিউজ ডেস্ক: একটি রাজ্যের সার্বিক অগ্রগতির আসল মাপকাঠি কি কেবল ভারী শিল্প ও বিপুল আর্থিক প্রবৃদ্ধি, নাকি সর্বস্তরের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা ও জীবনমানের মানোন্নয়ন? নীতি আয়োগ ও বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক সমীক্ষার সাম্প্রতিক তথ্যের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ ও গুজরাটের উন্নয়নের তুলনামূলক চিত্রে এই প্রশ্নটি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মোট উৎপাদন ও শিল্পায়নের অঙ্কে পশ্চিম ভারতের গুজরাট এগিয়ে থাকলেও শিক্ষা, পুষ্টি ও দারিদ্র্য দূরীকরণের মতো মানব উন্নয়ন সূচকে পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অনেকটাই এগিয়ে। অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গুজরাটের মডেলটি মূলত ভারী শিল্প, মূলধনি বিনিয়োগ ও পরিকাঠামো উন্নয়নের ওপর দাঁড়িয়ে। বর্তমানে গুজরাটের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিএসডিপি প্রায় ২৭ লক্ষ কোটি টাকার বেশি, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের জিএসডিপি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লক্ষ কোটি টাকার ঘরে। মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রেও গুজরাট অনেকটাই এগিয়ে; সে রাজ্যে গড় বার্ষিক মাথাপিছু আয় প্রায় ৩.১৩ লক্ষ টাকা, যা পশ্চিমবঙ্গের দ্বিগুণের কাছাকাছি।
'ইজ অব ডুইং বিজনেস' বা ব্যবসা করার সহজলভ্যতায় দেশের শীর্ষ সারিতে থাকা গুজরাটে রয়েছে উন্নত বন্দর ব্যবস্থা, টেক্সটাইল, পেট্রোকেমিক্যাল এবং বৃহৎ অটোমোবাইল হাব। বিপুল পরিমাণ সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের সুবাদে সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে চোখ রাখলে সামাজিক ও মানব উন্নয়নের সূচকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। নীতি আয়োগের বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক সংক্রান্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, দারিদ্র্য দূরীকরণের গতিতে গুজরাটের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ অনেক বেশি দ্রুত এগোচ্ছে এবং প্রায় ৯টি ক্ষেত্রে ইতিবাচক উন্নতি ঘটিয়ে বহু মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে। নারী শিক্ষা ও স্কুলশিক্ষার ক্ষেত্রে দুই রাজ্যের পার্থক্য বিশেষভাবে স্পষ্ট।
পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক উদ্যোগের ফলে মেয়েদের স্কুলছুট হওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এবং বর্তমানে রাজ্যে স্কুলে ছাত্রীদের উপস্থিতির হার আগে থেকে অনেকটাই বেড়েছে। অন্যদিকে শিল্পোন্নত গুজরাটে এই হার কিছুটা হলেও কমেছে।
জনস্বাস্থ্য এবং পুষ্টির প্রশ্নেও পশ্চিমবঙ্গ তুলনামূলকভাবে অনেক মজবুত অবস্থানে রয়েছে। গুজরাটে বিপুল অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটলেও শিশু মৃত্যু এবং শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার জাতীয় স্তরে এখনো একটি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত। বিপরীতে, সামাজিক প্রকল্প ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে পশ্চিমবঙ্গে শিশু মৃত্যু ও অপুষ্টির হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এছাড়া ভারী শিল্পে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও ধান, পাট ও সবজি উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গ দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজ্য হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। পাশাপাশি লাখ লাখ সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রেখেছে রাজ্যের বিশাল মাঝারি ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ক্ষেত্রটি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দুই রাজ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ মূলত উন্নয়নের দুটি ভিন্ন আদর্শের প্রতিফলন ঘটায়। গুজরাটের মডেলটি মূলত 'উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও শিল্পকেন্দ্রিক', যা আধুনিক পরিকাঠামো ও বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে ধনী অর্থনীতি গড়ে তুলতে সফল। অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গের মডেলটি মূলত 'সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমুখী', যেখানে সামাজিক সমতা রক্ষা, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রান্তিক শ্রেণির ক্ষমতায়নকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যবসা ও উচ্চ আয়ের দিক থেকে গুজরাট এগিয়ে থাকলেও সামাজিক সুরক্ষা ও মানব কল্যাণের দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ নিজস্ব অবস্থান ধরে রেখেছে।