কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: বর্ষার শেষ পর্বে ফের চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গি। এক মাসের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে পেরিয়ে গেল ৫ হাজারের গণ্ডি। রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, এ বছর এখনও পর্যন্ত আক্রান্ত ৫,০০২ জন। অথচ অগস্টের শেষে সংখ্যাটি ছিল ২,৫০০-র নীচে। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক সপ্তাহে নতুন করে আড়াই হাজারেরও বেশি সংক্রমণ ধরা পড়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত মুর্শিদাবাদে। তার পরেই কলকাতা এবং উত্তর ২৪ পরগনা।
রাজ্যের এই দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণই এখন স্বাস্থ্যকর্তাদের বড় চিন্তা। ইতিমধ্যে ২৯টি পুরসভা, ৮৫টি ব্লক এবং ২৭৮টি গ্রাম পঞ্চায়েতকে ডেঙ্গির ‘হটস্পট’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই এলাকাগুলিতে নজরদারি এবং রক্ত পরীক্ষা আরও বাড়ানো হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত জ্বরের রোগীদের চিহ্নিত করে ব্যাপক হারে ডেঙ্গি পরীক্ষা চালানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
মুর্শিদাবাদে সবচেয়ে বেশি, কলকাতাও তালিকার উপরে
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছবি মুর্শিদাবাদে। সেখানে এখনও পর্যন্ত ১,০৭২ জন ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন। কলকাতায় আক্রান্ত ৫০০ জন, উত্তর ২৪ পরগনায় ৪৫০ জন। গত কয়েক বছর ধরেই এই তিন এলাকায় ডেঙ্গির প্রকোপ তুলনামূলক বেশি বলে স্বাস্থ্য দফতরের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
কলকাতায়ও পরিস্থিতির উপর বাড়তি নজর রাখা হচ্ছে। ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শহরে ৪৬১টি ডেঙ্গি আক্রান্তের খবর পাওয়া গিয়েছিল এবং চিৎপুর-কাশীপুরের কিছু অংশ নিয়ে ৬ নম্বর ওয়ার্ডকে হটস্পট হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
কেন আচমকা এত বাড়ল আক্রান্ত?
স্বাস্থ্য দফতরের ব্যাখ্যায়, সংক্রমণ বৃদ্ধির পাশাপাশি পরীক্ষা ও নজরদারি বেড়ে যাওয়াও আক্রান্তের সংখ্যা প্রকাশ্যে আসার অন্যতম কারণ। ২ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গি প্রতিরোধ ও নজরদারির জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর বা SOP জারি করা হয়। সেখানে বাড়ি বাড়ি নজরদারি এবং উপসর্গ থাকা ব্যক্তির দ্রুত রক্ত পরীক্ষা করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ফলে আগে যে জ্বরের অনেক ঘটনাকে ‘অজানা জ্বর’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হত, এবার সেগুলির মধ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তদেরও চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে বলে স্বাস্থ্য দফতরের দাবি।
‘সামান্য জলই যথেষ্ট’, বাড়ির ভিতরেই বিপদ
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুরসভা বা প্রশাসনের দায়িত্ব নয়। বাড়ির ভিতরে বা আশপাশে জমে থাকা অল্প পরিমাণ জলও হয়ে উঠতে পারে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র। ফুলের টব, বালতি, ফেলে রাখা পাত্র, ছাদ, বারান্দা কিংবা বাগানে জমে থাকা জল নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জয়দীপ ঘোষের পরামর্শ, বর্ষায় বাড়ির প্রতিটি সম্ভাব্য জল জমার জায়গায় নিয়মিত নজর রাখতে হবে। কারণ ডেঙ্গির বাহক এডিস মশা অল্প পরিমাণ জমা জলেও বংশবিস্তার করতে পারে। দিনের বেলাতেও এই মশা কামড়ায়—তাই শুধু রাতে মশারি ব্যবহার করলেই ঝুঁকি পুরোপুরি কমে না।
জ্বর কমলেই বিপদ কেটেছে, এমন নয়
ডেঙ্গির ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। আচমকা জ্বর কমে যাওয়া মানেই রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন—এমনটা ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। সংক্রমণের তৃতীয় থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে রোগের ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ দেখা দিতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, লাগাতার বমি, নাক বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, বমি বা মলের সঙ্গে রক্ত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা কিংবা দ্রুত শ্বাস নেওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
শুধু প্লেটলেট কমলেই ডেঙ্গির ভয়, এই ধারণাও ভুল
ডেঙ্গি হলেই প্লেটলেট কমবে এবং প্লেটলেটের সংখ্যা দেখেই রোগীর অবস্থা বোঝা যাবে—এই ধারণা নিয়েও চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা রয়েছে। রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা, রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা, শরীরে তরলের ভারসাম্য, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং রোগের সতর্কতামূলক লক্ষণ—সব কিছু মিলিয়েই পরিস্থিতি বিচার করতে হয়।
অর্থাৎ, শুধু একটি রিপোর্ট হাতে নিয়ে বাড়িতে বসে চিকিৎসা করার চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
নিজে থেকে ওষুধ নয়
ডেঙ্গির সময় নিজের ইচ্ছায় ওষুধ খাওয়ার প্রবণতা নিয়েও চিকিৎসকদের উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ এগুলি রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জ্বর বা ব্যথার ওষুধ নেওয়ার ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।
এই মুহূর্তে ডেঙ্গির নির্দিষ্ট কোনও অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তরল, পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সহায়ক চিকিৎসাই মূল ভরসা। গুরুতর পরিস্থিতিতে হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন হতে পারে।
এক মাসে আক্রান্ত প্রায় দ্বিগুণ—এই পরিসংখ্যানই সতর্কবার্তা দিচ্ছে। বর্ষা পুরোপুরি বিদায় নেওয়ার আগে ডেঙ্গির দাপট আরও বাড়ে কি না, এখন সেটাই নজরে। প্রশাসনের নজরদারির পাশাপাশি বাড়ি, পাড়া এবং এলাকার জমা জল দ্রুত সরানোই সংক্রমণ ঠেকানোর প্রথম লড়াই।