নিউজ ডেস্ক: দক্ষিণ কলকাতার ব্যস্ততম এক মেট্রো স্টেশনে প্রতিদিন নিত্য যাত্রীরা সাক্ষী থাকেন এক দৃশ্যের যা কবীর সুমনের একটি গানের লাইন মনে করিয়ে দেয় - “এ কিশোর পারবে কি এই বোঝা টানতে?” এখানে কিশোরটির নাম আব্দুল নস্কর; স্বপ্ন দেখে শিক্ষক হওয়ার। দক্ষিণ কলকাতার যতীন দাস পার্ক মেট্রো স্টেশনের আশুতোষ কলেজ লাগোয়া ১ নম্বর গেট হয়ে উঠেছে তাঁর পড়াশোনার জায়গা আর মেট্রোর সিঁড়ি তাঁর পড়ার টেবিল। প্রতিদিন সেখানেই বই-খাতা নিয়ে বসে তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়া আব্দুল। প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলেই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিজের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখছে সে। আব্দুলের বাড়ি বারুইপুরে হলেও তাঁর বাবার দোকান হাজরাতে হওয়ায় কলকাতার বেলতলার একটি স্কুলে এখন সে পড়ছে। আব্দুলের বাবা শাহিফুল নস্করের স্টেশনের সামনের ফুটপাথেই ছোট একটি দোকান, যেখানে তিনি সকাল থেকে রাত অবধি চা-ডিম-পাউরুটি-ঘুঘনি বিক্রি করে কোনোরকম সংসার চালান।
রোজ ভোর চারটেয় বাবার সাথে সে চলে আসে কলকাতয়। তাঁর সারাদিনের পরিশ্রমের পর মেট্রোর ভিতরটা ঠান্ডা হওয়ায় সেখানেই একটু স্বস্তি খুঁজে পায় আব্দুল। তাই মেট্রোর সিঁড়িতেই ছড়া মুখস্থ করে। প্রিয় বিষয় বাংলা ও অংক তবে ইংরাজীতে ভীষণ ভয়। বই-খাতা নিয়ে বসে থাকা বছর সাত-আটের আব্দুলকে দেখে থমকে যায় ব্রাত্যজন। চারপাশে নিত্যযাত্রীদের ব্যস্ত আনাগোনা। কেউ স্টেশনে ঢুকছেন, কেউ বেরিয়ে যাচ্ছেন। সেই ভিড়ের মধ্যেই নিজের কাজ করে যাচ্ছে আব্দুল। ছবিটা অনেকটা কবীর সুমনের গানের মতোই “আকাশে ঘুড়ির ঝাঁক ছেলেটাকে ডাকছে”। অভাব তাকে মাটির সঙ্গে আটকে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর স্বপ্নের উড়ান চলছে। অভাব রয়েছে, প্রতিকূলতা রয়েছে, কিন্তু পড়াশোনা থামানোর ইচ্ছে নেই।
ছোট বয়সেই জীবনের বাস্তবতার ভার সে বুঝতে শিখেছে। শিক্ষা তাকে এই সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে অন্য এক জীবনের দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে তাঁর দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। আব্দুল বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য শিক্ষক হতে চায়। শিক্ষক হলে নিজের পড়াশোনাটাও হবে, পাশাপাশি বাচ্চাদেরও পড়াতে পারবে। মেট্রো স্টেশনের পাশেই আশুতোষ কলেজ এবং নিত্যদিন কলেজ পড়ুয়াদের দেখে আব্দুলেরও কলেজে যেতে ইচ্ছা করে।
আব্দুলের বাবা তাঁর ছেলেকে কোনওভাবেই দোকানের কাজ করতে দেননা। তিনি নিজে খুব বেশি দূর পড়োশোনা করার সুযোগ পাননি তাই নিজের ছেলের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই অভাব রাখতে চাননা। পাশাপাশি ইচ্ছা ছেলেকে ক্যারাটে শেখানোর তবে অভাবের জন্য কিছুটা সংশয় আছে। রাজ্যে একদিকে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি অন্যদিকে বহু সংখ্যক স্কুল বন্ধ হয়েগেছে। এই রুঢ় বাস্তবতার সামনে ছোট্টো আব্দুল এক টুকরো ‘সাহস’ হয়ে আমাদের স্বপ্নহীন জীবনকে আলো জোগায়। তাঁর স্বপ্নের ঘুড়ি সত্যিই হয়তো একদিন স্পর্শ করবে আকাশ।
