নয়াদিল্লি: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ঘিরে কেন্দ্র ও বিরোধীদের সংঘাত আরও তীব্র। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের ‘জনতার অভিশংসন’ কর্মসূচির ঠিক আগেই INDIA জোটকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবকে সরাসরি নিশানা করে তাঁর প্রস্তাব, এসআইআর নিয়ে সংসদে বিশেষ অধিবেশন ডাকা হোক। সেখানে আলোচনায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত বিজেপি। দলের কিছুই লুকোনোর নেই বলে দাবি শাহের। শুক্রবার লখনউয়ে উত্তরপ্রদেশ বিজেপির রাজ্য কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে উত্তপ্ত জাতীয় রাজনীতি।
শাহ বলেন, ‘‘রাহুল বাবা, আমি আপনাদের দু’জনকে এখান থেকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। বিজেপি সংসদে এই বিষয়ে আলোচনা করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমাদের কিছু লুকোনোর নেই। আসুন, সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকা হোক।’’ তাঁর অভিযোগ, বিরোধীরা সংসদে এই বিষয়ে আলোচনা করতে চান না। বরং সংসদের কাজকর্ম ব্যাহত করে রাজনৈতিক হট্টগোল তৈরি করতেই বেশি আগ্রহী তাঁরা। শাহের কটাক্ষ, সংসদের ভিতরে আলোচনায় না গিয়ে বাইরে রাজনৈতিক প্রচার চালাচ্ছেন বিরোধী নেতারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই চ্যালেঞ্জের সময়টিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, শনিবারই দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতীকী ‘জনতার অভিশংসন’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে বিরোধী জোট। তার পরের দিন, রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে এসআইআর এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার প্রতিবাদে বড় সমাবেশ করার কথা INDIA জোটের। ফলে বিরোধীদের আন্দোলনের ঠিক আগে শাহের এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক পাল্টা আক্রমণ হিসেবেই দেখছে সংশ্লিষ্ট মহল।
প্রথমে বিরোধীদের এই কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মক পার্লামেন্ট’। পরে তার নাম বদলে রাখা হয় ‘জনতার অভিশংসন’।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংসদের আদলে একটি প্রতীকী অধিবেশন বসিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি তুলে ধরা হবে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে সেখানে অভিশংসনের প্রস্তাব পেশ করবেন বলে জানা গিয়েছে। রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধী জোটের একাধিক নেতার বক্তব্য রাখার কথা। তবে এই কর্মসূচি কোনও প্রকৃত সাংবিধানিক অভিশংসন প্রক্রিয়া নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক প্রতিবাদের একটি প্রতীকী আয়োজন।
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে সরানোর জন্য নির্দিষ্ট সাংবিধানিক পদ্ধতি রয়েছে। সংসদের দুই কক্ষেই বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়। এর আগে জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে বিরোধীদের দেওয়া নোটিস লোকসভার স্পিকার ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যান খারিজ করে দিয়েছিলেন। ফলে বিরোধীদের এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক ভাবে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জোরদার করা।
এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের মূল অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় বহু মানুষের ভোটাধিকার বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলি। তাদের দাবি, এসআইআর বন্ধ করতে হবে, সংশোধনের আগের ভোটার তালিকা পুনর্বহাল করতে হবে এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে পদত্যাগ করতে হবে।
অন্য দিকে, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা নির্ভুল করতেই এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া। মৃত, স্থানান্তরিত, অযোগ্য এবং একাধিক জায়গায় নাম থাকা ভোটারদের চিহ্নিত করে তালিকা সংশোধন করা হচ্ছে। প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়লে তা ফের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও রয়েছে। ফলে এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি প্রকৃত ভোটারদের অধিকার এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বিরোধীদের অভিযোগের জবাবে শাহের পাল্টা বক্তব্য, নির্বাচনে পরাজয়ের দায় স্বীকার না করে ভোট চুরির অভিযোগ তুলছে বিরোধীরা। ক্রিকেটের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কোনও দল ম্যাচে হারলে তাদের আরও অনুশীলন করা উচিত। কিন্তু রাহুল গান্ধী এবং অখিলেশ যাদবের মতো নেতারা পরাজয় মেনে নেওয়ার বদলে আম্পায়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। অর্থাৎ, নির্বাচনে হারলেই ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করা হচ্ছে বলে বিরোধীদের কটাক্ষ করেন তিনি।
বিজেপির সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্যের কথাও এ দিন তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, বিহার, দিল্লি, পুদুচেরি এবং অসমের নির্বাচনে বিজেপি ও NDA-র সাফল্যের উল্লেখ করেন তিনি। বিরোধীদের আক্রমণ করে শাহের দাবি, একের পর এক নির্বাচনে পরাজয়ের পর তারা বুঝতে পেরেছে যে বিজেপিকে ভোটে হারানো কঠিন। তাই ভোট চুরির অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।
অন্য দিকে, উত্তরপ্রদেশের সাম্প্রতিক বিধান পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও রাজনৈতিক চাপানউতোর চলছে। স্নাতক ও শিক্ষক আসনের ১১টি কেন্দ্রে নির্বাচনে বিজেপি ছ’টি এবং সমাজবাদী পার্টি পাঁচটি আসন পেয়েছে। ফলাফলকে বিজেপির কাছে রাজনৈতিক ধাক্কা বলে ব্যাখ্যা করেছেন অখিলেশ যাদব। তাঁর দাবি, ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ফল সমাজবাদী পার্টির পক্ষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ফলে রাহুলের পাশাপাশি অখিলেশকেও শাহের সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
এসআইআর নিয়ে সংঘাত অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের বাদল অধিবেশনেও বিহারের ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে সংসদের কাজ বারবার ব্যাহত হয়েছিল। পরবর্তী অধিবেশনগুলিতেও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘাত দেখা গিয়েছে। রাহুল গান্ধী আগেও ভোট চুরির অভিযোগ নিয়ে সংসদে শাহকে আলোচনার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। এ বার শাহ নিজেই বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রস্তাব দিয়ে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন।
ফলে এখন নজর বিরোধীদের পরবর্তী কর্মসূচির দিকে। শাহের প্রস্তাব মেনে সংসদে বিশেষ অধিবেশন ডাকার দাবি তুলবে কি INDIA জোট? নাকি সংসদের বাইরে আন্দোলন আরও তীব্র করবে বিরোধীরা? একই সঙ্গে সরকার সত্যিই এসআইআর নিয়ে বিশেষ অধিবেশন ডাকার পথে হাঁটবে কি না, তা নিয়েও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে কেন্দ্র ও বিরোধীদের রাজনৈতিক সংঘাত আগামী দিনেও জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে চলেছে।




