কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা মিলছে না, এই অভিযোগে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মহিলাদের ক্ষোভ, পথ অবরোধ, রেল অবরোধ। কোথাও আবার স্থানীয় বিজেপি নেতা-মন্ত্রীর বাড়ি বা কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ। এই আবহেই এ বার সরাসরি বিজেপি সরকারকে নিশানা করলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, ভোটের আগে মহিলাদের জন্য একের পর এক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতির উল্টো পথে হাঁটছে সরকার।
মমতার দাবি, বিধানসভা নির্বাচনের আগে পর্যন্ত রাজ্যের যে মহিলারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা পেতেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশের ভাতা এখন বন্ধ অথবা আটকে রয়েছে। যদিও এই পরিসংখ্যানের সরকারি ভিত্তি এখনও স্পষ্ট নয়, মমতার বক্তব্য, বিপুল সংখ্যক মহিলা বর্তমানে তাঁদের প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত। আর সেই ক্ষোভই এখন রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্যে আসছে।
অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ার অভিযোগে একাধিক জেলায় বিক্ষোভের ঘটনায় ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। কোথাও রাস্তায় বসে পড়েছেন উপভোক্তারা, কোথাও রেললাইন অবরোধ করে ক্ষোভ জানিয়েছেন মহিলারা। স্থানীয় বিজেপি নেতা এবং মন্ত্রীদের ঘিরেও বিক্ষোভ হয়েছে বলে অভিযোগ। ফলে একটি সরকারি প্রকল্পের টাকা নিয়ে শুরু হওয়া অসন্তোষ ক্রমশ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতেই মমতার কটাক্ষ, “ভোটের আগে যা বলেছিল, এখন তার উল্টো করছে।” তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনী প্রচারের সময় অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা জটিল শর্তের কথা বলা হয়নি। এখন টাকা পেতে গেলে উপভোক্তাদের সামনে একের পর এক নিয়ম এবং ফর্মের বোঝা চাপানো হচ্ছে।
মমতার প্রশ্ন, কে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাবেন আর কে পাবেন না, তা ঠিক করার অধিকার কোনও রাজনৈতিক দলের নেই। তাঁর বক্তব্য, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও স্বচ্ছ নিয়ম থাকা প্রয়োজন। যোগ্য উপভোক্তারা যাতে কোনও ভাবেই বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
এখানেই থামেননি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। মমতার দাবি, ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূলের প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাঁর কটাক্ষ, বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে সরকারের যতটা তৎপরতা, সাধারণ মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ভাতার টাকা পৌঁছল কি না, তা দেখার ক্ষেত্রে সেই তৎপরতা নেই।
তবে তৃণমূলের এই অভিযোগ মানতে নারাজ বিজেপি। অন্নপূর্ণা যোজনাকে ঘিরে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভের পিছনে তৃণমূলের ‘উস্কানি’ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক স্বার্থে সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এর মধ্যেই পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের একটি মন্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, মহিলাদের ঢালাও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দিয়ে তৃণমূল তাঁদের ‘অভ্যাস খারাপ’ করে দিয়েছে। এই মন্তব্যকে সামনে রেখে বিজেপির বিরুদ্ধে আরও সুর চড়িয়েছে তৃণমূল। তাদের বক্তব্য, মহিলাদের প্রাপ্য আর্থিক সহায়তাকে ‘অভ্যাস’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ফলে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা নিয়ে ক্ষোভ এখন আর নিছক প্রশাসনিক অভিযোগের মধ্যে আটকে নেই। তার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে ভোটের প্রতিশ্রুতি, মহিলা ভোটব্যাঙ্ক, সরকারি প্রকল্পের যোগ্যতা এবং রাজ্যের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সংঘাত।
এক দিকে রাস্তায় নেমে টাকা পাওয়ার দাবি জানাচ্ছেন উপভোক্তারা, অন্য দিকে সেই বিক্ষোভকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে পাল্টা অভিযোগ করছে বিজেপি। আর মাঝখানে অন্নপূর্ণার টাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক উত্তাপ।
ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি, ভোটের পরে ভাঁওতা—এই ফারাকের অভিযোগই এখন মমতার প্রধান অস্ত্র। অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষোভ যদি আরও ছড়ায়, তা হলে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে তৃণমূলের অন্যতম বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে এই ইস্যু।