আরামবাগ: ডাক্তারি পরীক্ষায় ফেল করা পড়ুয়াদের পাশ করানোর দাবিকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত আরামবাগের প্রফুল্লচন্দ্র সেন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। অধ্যক্ষের ঘরে ঢুকে তাঁকে হেনস্থা ও অশালীন ভাষায় আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে একদল বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় এবার সরাসরি স্বাস্থ্য ভবন, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (IMA) দ্বারস্থ হলেন মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ রমাপ্রসাদ রায়। তাঁর আশঙ্কা, আরামবাগ মেডিক্যালে ফের ‘অভীক-বিরূপাক্ষ সংস্কৃতি’ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার। এমবিবিএস পার্ট ওয়ানের পরীক্ষায় কয়েকজন পড়ুয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে ফেল করানো হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে অধ্যক্ষের ঘরে বিক্ষোভ দেখানো হয়। অধ্যক্ষের দাবি, যাঁরা সেদিন বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন, তাঁদের কেউই ওই মেডিক্যাল কলেজের পড়ুয়া বা চিকিৎসক নন। আরামবাগের আইএমএ সম্পাদক অশোক নন্দীর নেতৃত্বে এই বিক্ষোভ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
অধ্যক্ষের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা তাঁকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করেন। এমনকী মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সম্মানহানি করা হয়েছে এবং শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছে। এই ঘটনার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার অধ্যক্ষ রমাপ্রসাদ রায় বলেন, “এ তো অভীক-বিরূপাক্ষের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে! আমাদের দাবি, মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা হোক।”
উল্লেখ্য, আরজি কর-কাণ্ডের পর মেডিক্যাল কলেজগুলিতে ভয়ের পরিবেশ তৈরির অভিযোগে সরব হয়েছিলেন জুনিয়র চিকিৎসকেরা। সন্দীপ ঘোষ-ঘনিষ্ঠ অভীক দে এবং বিরূপাক্ষ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছিল। আরামবাগের সাম্প্রতিক ঘটনাকে সেই পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন অধ্যক্ষ।
কী বলছেন আইএমএ নেতা?
অন্যদিকে, অধ্যক্ষের অভিযোগ মানতে নারাজ আইএমএ-র আরামবাগ শাখার সম্পাদক অশোক নন্দী। তাঁর পাল্টা অভিযোগ, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রধান শঙ্করনাথ ঝাঁ আগে থেকেই কয়েকজন পড়ুয়াকে ফেল করানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। পরীক্ষার ফলেও তার প্রতিফলন ঘটেছে বলে দাবি তাঁর। কেন শুধু কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগেই এমন ঘটনা ঘটল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন অশোক।
তাঁর বক্তব্য, তিনি আইএমএ স্টুডেন্টস নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান হিসেবে পড়ুয়াদের অভিযোগ শুনে অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন। কোনও হাঙ্গামা বা শিক্ষককে অসম্মান করার ঘটনা ঘটেনি বলেও দাবি করেছেন তিনি। প্রয়োজনে সেদিনের সমস্ত ভিডিয়ো ফুটেজ খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন অশোক।
কী বলছে কলেজ কর্তৃপক্ষ?
অধ্যক্ষের বক্তব্যের পক্ষেই সওয়াল করেছেন কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রধান শঙ্করনাথ ঝাঁ। তাঁর দাবি, পরীক্ষার মূল্যায়নের নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। কোনও পড়ুয়ার ফলাফল নিয়ে আপত্তি থাকলে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো উচিত। বহিরাগতদের কলেজে ঢুকে বিক্ষোভ দেখানোয় শিক্ষকরা অসন্তুষ্ট বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আইএমএ-র রাজ্য সম্পাদক শান্তনু সেন অবশ্য অশোক নন্দীর কলেজে যাওয়ার মধ্যে আপত্তির কিছু দেখছেন না। তাঁর বক্তব্য, আইএমএ-র মেডিক্যাল স্টুডেন্টস নেটওয়ার্ক পড়ুয়াদের দাবিদাওয়া দেখার জন্যই তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে, পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে পড়ুয়াদের অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন অধ্যক্ষ বনাম আইএমএ নেতার সংঘাতে পরিণত হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষক-চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এবার স্বাস্থ্য ভবন এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ করে, সেদিকেই নজর।




