নিউজ ডেস্ক: অরুণাচলপ্রদেশের প্রস্তাবিত ১১ হাজার মেগাওয়াটের ‘সিয়াং আপার বহুমুখী প্রকল্প’ নিয়ে পাহাড়ি রাজ্যটিতে অচলাবস্থা কাটছে না। একদিকে পৈতৃক জমি ও পরিবেশ রক্ষার দাবিতে স্থানীয় আদিবাসী সংগঠনগুলির লাগাতার প্রতিরোধ, অন্যদিকে সীমান্তের ওপারে চিনের সক্রিয়তাকে সামনে রেখে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে অনড় রাজ্য সরকার। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে অরুণাচলের রাজনীতি ও সমাজজীবন এখন তীব্র আবর্তে।
নয়া দিল্লির কৌশলগত অবস্থানকে স্পষ্ট করে রাজ্যের ক্যাবিনেট মন্ত্রী ওজিং তাসিং জানিয়েছেন, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে রাজ্য কোনওভাবেই পিছু হটবে না। তিব্বতের প্রান্তে ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর বেজিংয়ের বিশালাকার বাঁধ ও জল-পরিকাঠামো নির্মাণের পাল্টা হিসেবে এই প্রকল্পকে কৌশলগত ঢাল বলে দেখছে প্রশাসন।
তাসিংয়ের বক্তব্য, ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি বা বন্যা নিয়ন্ত্রণের চেয়েও বড় বিষয় হল সীমান্ত ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা। সরকারের এই কৌশলগত যুক্তির উল্টো পিঠেই ফুঁসছে উপত্যকা। ‘সিয়াং ইন্ডিজেনাস ফার্মার্স ফোরাম’-সহ একাধিক স্থানীয় জনজাতি মঞ্চ প্রকল্পের বিরুদ্ধে লাগাতার মাঠে নেমেছে। তাঁদের মূল ক্ষোভ ভিটেমাটি উচ্ছেদ ও বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংস নিয়ে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, হিমালয়ের অত্যন্ত সংবেদনশীল ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় এমন দৈত্যাকার কংক্রিটের বাঁধ তৈরি চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। চাষের জমি তলিয়ে যাওয়া এবং উপত্যকার বিস্তীর্ণ জনবসতি নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশঙ্কায় সম্প্রতি বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়,কোথাও সরকারি সমীক্ষার কাজ আটকে দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও বিধায়কদের বাড়ি ঘেরাওয়ের ঘটনা ঘটেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি প্রসঙ্গে কড়া বার্তা দিয়ে মন্ত্রী তাসিং জানান, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও হিংসা বরদাস্ত করবে না সরকার। একই সঙ্গে তাঁর ও সিয়াং জেলার উপ-আয়ুক্ত তায়ি তাগ্গু-র দাবি, বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ আলাদা। প্রশাসনের মতে, নদী তীরবর্তী ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ গ্রামবাসী ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের শর্তে সমীক্ষার পক্ষে সায় দিয়েছেন।
সংঘাত মেটাতে মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু অবশ্য কিছুটা সংযত সুর নিয়েছেন। তিনি স্থানীয়দের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, এখনই মূল বাঁধ তৈরির কাজ শুরু হচ্ছে না। বর্তমানে কেবল ‘প্রি-ফিজিবিলিটি রিপোর্ট’ বা প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমীক্ষা হবে। পরিবেশের ভারসাম্য, জনজীবন ও কারিগরি দিক বিচার করে যদি দেখা যায় প্রকল্পটির ঝুঁকি বেশি, তবে তা রূপায়ণে জোর দেওয়া হবে না।
আপাতত সিয়াং নদীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত টানাপড়েন। একদিকে দেশের অখণ্ডতা ও ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে জল-জঙ্গল-জমিনের সুরক্ষায় স্থানীয় জনজাতির অস্তিত্বের লড়াই।
