নিউজ ডেস্ক: আকাশে-বাতাসে পুজোর গন্ধ ছড়ালেও শিল্পাঞ্চল আসানসোলে শারদোৎসবের আসল আবহ তৈরি করে দিল থিয়েটারের মঞ্চ। মহালয়ার পুণ্যলগ্নে বার্নপুরের ভারতী ভবন প্রেক্ষাগৃহে যেন এক লহমায় জীবন্ত হয়ে উঠল এক সাবেক বনেদি বাড়ির অন্দরমহল। স্থানীয় নাট্যদল ‘ফিনিক্স’-এর নতুন প্রযোজনা ‘খারিজ’-এর হাত ধরে দর্শক সাক্ষী থাকলেন এমন এক অভিজ্ঞতার, যা শুধু নাটকের বাঁধুনিতেই আটকে রইল না, ছড়িয়ে পড়ল উৎসবের আমেজেও।
উদয়ন চট্টোপাধ্যায়ের রচনা এবং অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় তৈরি এই নাটকের মূল মেরুদণ্ড কয়লাঞ্চল ও তার পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ সমাজের দ্বন্দ্ব। কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু অন্ডালের উখরা অঞ্চলের বর্ধিষ্ণু রায়চৌধুরী পরিবার। তাদের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো ঘিরেই নাটক আবর্তিত। কিন্তু উৎসবের আবহে ছন্দপতন ঘটে সপ্তমীর সকালে পুজোর উনুন কাটতে গিয়ে হঠাৎ মাটির তলা থেকে বেরিয়ে আসে এক নরকঙ্কাল। মুহূর্তে জমিদারি অহংকার আর ধর্মীয় আচারের মাঝে ঢুকে পড়ে রহস্যের কালো ছায়া। চাউর হওয়া খবরের টানে বাড়িতে ভিড় জমায় পুলিশ, সাংবাদিক ও রাজনীতিকরা। মানুষের লোভ, জমি দখলের চক্রান্ত আর সামাজিক টানাপোড়েনের বাস্তব ছবি এক নিপুণ বিন্যাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই আখ্যানে।
তবে কেবল গল্প বা রহস্য নয়, আসানসোলের নাট্যপ্রেমীদের সবচেয়ে বেশি তাক লাগিয়েছে মঞ্চসজ্জা ও আবহ। নবপত্রিকা স্নান থেকে শুরু করে সন্ধিপুজোর আরতি, নবমীর বলিদান কিংবা বিজয়ার সিঁদুরখেলা দুর্গাপুজোর প্রতিটি আচার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মঞ্চে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এমনকি প্রেক্ষাগৃহের দর্শকাসনের মাঝখান দিয়ে ঢাকের আওয়াজে নবপত্রিকার পালকি যখন মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায়, গোটা প্রেক্ষাগৃহে তখন কার্যত পুজোমন্ডপের রূপ ধারণ করে।
এই মঞ্চের মূল আকর্ষণ ছিল ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে তৈরি সুবিশাল এক প্রতিমা। মাটির বদলে কাগজের কার্ডবোর্ডের বাক্স, সাধারণ কাগজ, রং আর জরির নকশায় প্রায় তিন মাসের পরিশ্রমে এই প্রতিমা গড়ে তুলেছেন শিল্পী রানা শর্মা। কেবল চুল আর হাতের অস্ত্রটুকু বাদ দিলে গোটা প্রতিমাই তৈরি হয়েছে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য দিয়ে। পরিচালক অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, রানার এই মঞ্চসজ্জা ও প্রতিমা নির্মাণ ছাড়া এমন ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেওয়া অসম্ভব ছিল।
রহস্যের টানটান ক্লাইম্যাক্স ও আবেগঘন সমাপ্তির পর দর্শকদের জন্য ছিল আরও এক চমক। নাটকের শেষে উপস্থিত প্রতিটি দর্শকের পাতে তুলে দেওয়া হয় গরম গরম পোলাও আর আলুর দম দলের পক্ষ থেকে যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মঞ্চের পুজোর ভোগ’। উৎসবের এমন আন্তরিক উদযাপনে মুগ্ধ শিল্পাঞ্চলের নাট্যপ্রেমীরা। সব মিলিয়ে, রহস্য আর পরম্পরার মেলবন্ধনে মহালয়ার সন্ধ্যায় ফিনিক্সের এই উপস্থাপনা যেন এক অনন্য নাট্য-উৎসবে রূপ নিল।
