নিউজ ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে কলকাতা কেন্দ্রিক দূর্গা পুজোর আড়ালে লুকিয়ে আছে মায়ের বিভিন্ন অজানা রূপ। আমরা চিরকাল দেখে এসেছি দূর্গার দশটি হাত। কিন্তু বাংলায় এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে দূর্গার হাত দশের কম বা অধিক। পশ্চিমবঙ্গের কিছু প্রাচীন বনেদি পরিবারে ১২ থেকে ১৮ হাতের দূর্গার দেখা মেলে। শাক্ত মতে ও প্রাচীন পারিবারিক রীতি মেনে এখানে দূর্গার পুজো হয়ে থাকে। তবে কখোনোই বিজোড় সংখ্যক হাতের দূর্গা দেখা যায়নি।পশ্চিম মেদিনীপুরের কনাসোলের ঝাড়েশ্বরনাথ মন্দিরের দূর্গা মূর্তিটি ‘অষ্টাদশভুজা মহালক্ষ্মী চণ্ডী’ নামে পূজিত হন। এই দেবীকে লাল মালা ও ছৌ মুখোশ দিয়ে সাজানো হয়। আর দু’পাশে থাকে কঙ্কালসার দুই সহচর, যাদের দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের প্রতীক বলে মনে করেন স্থানীয়রা। একই ভাবে পূর্ব মেদিনীপুরে মাংলইয়ের রাধা দামোদর মন্দিরে রয়েছে টেরাকোটার তৈরি ১৮ হাতের দুর্গামূর্তি। ছাতনা রাজপরিবারের কয়েকটি পরিবারে ১৬ ও ১৮ হাতের দূর্গার আরাধনা করা হয়।
বাঁকুড়ার আঞ্চলিক ইতিহাসের গবেষক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে এই মূর্তিগুলো বহু প্রাচীন। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের শিল্পের নির্দশন হিসেবে মন্দিরের দেওয়ালে এই মূর্তিগুলি খোদাই থাকত। মল্ল ও ভান রাজাদের আমলে নির্মিত শিবমন্দিরগুলির সঙ্গে এই শিল্পের যোগ রয়েছে। আরও এক আঞ্চলিক ইতিহাসবিদ সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, মার্কণ্ডেয় ও কালিকা পুরাণে দূর্গার দ্বাদশভুজা, ষোড়শভুজা এবং অষ্টাদশভুজা রূপের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৮ হাতের রূপটি ‘মহালক্ষ্মী’ বা ‘রাজরাজেশ্বরী’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর হাতে থাকে ত্রিশূল, খর্গ, চক্র, শঙ্খ, ধনুক-বাণ, বজ্র-সহ বিভিন্ন অস্ত্র। পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় বাংলার বাঁকুড়া, বর্ধমান ও মেদিনীপুর অঞ্চলে তন্ত্রসাধনার প্রচলন ও প্রভাবের কারণে এই বহু-হাতের চণ্ডীর আরাধনা দীর্ঘদিন ধরে টিকে রয়েছে বলেই মত বিভিন্ন গবেষকের।অষ্টাদশ শতকের পর বারোয়ারি পুজোর প্রসারের সঙ্গে দশভুজা দূর্গার জনপ্রিয়তা বাড়ে। কিন্তু চন্দ্রকোনা, ছাতনা, ওন্দা ও কাটোয়ার কয়েকটি বনেদি পরিবারের পুরোহিতরা জানিয়েছেন, তাঁদের পারিবারিক শাস্ত্রেও ১৬ বা ১৮ হাতের দূর্গা পুজোর বিধান রয়েছে। তবে রাঢ় বাংলায় পুরনো বহু-হাতের চণ্ডী আরাধনার ঐতিহ্য এখনও বজায়। বর্তমানে বাঁকুড়া, পূর্ব মেদিনীপুর এবং পূর্ব বর্ধমানের কয়েকটি আধুনিক পুজো কমিটি ১২ থেকে ১৮ হাতের দূর্গামূর্তি তৈরি করাচ্ছে। এর ফলে মায়ের ঐতিহ্যবাহী অজানা রূপ আবারও দেখা যাবে।
এত সংখ্যক হাতের অর্থ আসলে কী সেই প্রসঙ্গে পুরাণ বিশারদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর ব্যাখা করে বলেছেন হাতের এই কাহিনি আসলে সম্পূর্ণ রূপক। যত বেশি হাত, ততো বেশি অস্ত্র অর্থাৎ ততো বেশি শক্তি। দেবতারা একা মহিষাসুরকে হারাতে না পারায় তাঁদের সকলের শক্তি এক দেহে, এক ইচ্ছায় মিলিত হয়েছিল। বহু হাত সেই সম্মিলিত শক্তির দৃশ্যমান রূপ। হাতের সংখ্যা ২ থেকে ৮, ১০, ১৮ কিংবা সহস্র সংখ্যায় বার বার বদলেছে কিন্তু মূল ভাবটি এক আছে যার প্রধান উদ্দেশ্য সীমাহীন শক্তিকে মূর্তির মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করা। তিনি বলেন, ‘রামকৃষ্ণ পরমহংস দূর্গার রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন ১৮ হাত থেকে শুরু করে ২ হাত পর্যন্ত দেখেছে। তারপর কিছুই দেখেনি। এটাই আসল সাধকের অন্তর্দৃষ্টি।’
প্রত্নতত্ত্ববিদ শুভ মজুমদারের মতে, প্রথমে দেবী ছিলেন মহিষাসুরমর্দিনী। পরে ক্রমশ দুর্গারূপটি আসে। এখনও পর্যন্ত প্রাচীনতম যে মহিষাসুরমর্দিনীর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, সেটি রাজস্থানের নাগর থেকে, তাতে দেবীর ৪টি হাত। আবার উত্তর দিনাজপুরের বেতনা থেকে ৩২ হাতের দুর্গাও পাওয়া গিয়েছে।অনেকের মতে দূর্গার বর্তমান মূর্তি লক্ষণ সেনের সময় থেকে প্রচলিত। শিল্পীর কল্পনায় পুত্র–কন্যাদের সঙ্গে নিয়ে উমার বাপের বাড়ি আসার রূপ যা দেবীকে আমাদের বাড়ির মেয়ে করে তোলে, তা মহিষাসুরমর্দিনীর অন্য কোনও মূর্তিতে সম্ভব নয়। পুরাণ দেবীকে কঠোর এবং রণচণ্ডী হিসেবে দেখিয়েছে বরাবরই। কিন্তু বাংলা চিরকালই প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা থেকে ভাবের অন্তর্দৃষ্টিতে মায়ের উপাসনা করে এসেছে; এটাই বাংলার নিজস্ব দেবী আরাধনার বৈশিষ্ট্য।
