বেঙ্গালুরু: বাড়িতে মাটন কারি রান্না হয়েছে। আত্মীয়দের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন। সেই আমন্ত্রণেই একে একে বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু খাবারের নিমন্ত্রণ যে মৃত্যুফাঁদ, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি তাঁরা। অভিযোগ, খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে আত্মীয়দের অচেতন করার পর শিলনোড়া দিয়ে আঘাত করে খুন করা হত। প্রতিবেশীরা যাতে কোনও আওয়াজ শুনতে না পান, সে জন্য চালিয়ে দেওয়া হত টেলিভিশন, বাড়িয়ে দেওয়া হত শব্দের মাত্রা। তার পর দেহ মুড়ে বস্তায় ভরে গাড়িতে চাপিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ফেলে আসার অভিযোগ উঠেছে বেঙ্গালুরুর এক ক্যাবচালকের বিরুদ্ধে।
স্ত্রী-সহ পরিবারের ৭ সদস্যকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন ৫২ বছরের এস ইন্দুশেখর।
বেঙ্গালুরুর রাজাজিনগরের ভি ব্লকের একটি ভাড়া বাড়িতে ঘটেছে এই ঘটনা। পুলিশ সূত্রে খবর, 14 থেকে 31 অক্টোবরের মধ্যে প্রায় 15 দিনের ব্যবধানে একে একে সাত জনকে খুন করা হয়েছে বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন অভিযুক্তের স্ত্রী সুনীতা, শাশুড়ি রূপাবতী, দুই শ্যালক শিবকুমার ও শঙ্কর, তাঁদের দুই স্ত্রী দিব্যা ও নলিনী এবং 7 বছরের এক শিশু পুনীত। একাধিক জায়গা থেকে এখনও পর্যন্ত তিনটি দেহ উদ্ধার হয়েছে। বাকিদের দেহের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ।
মাটন কারির নিমন্ত্রণেই বাড়িতে ডেকে আনার অভিযোগ
তদন্তকারীদের দাবি, প্রথমে নিজের স্ত্রী সুনীতাকে খুন করেন ইন্দুশেখর। তার পর আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের বাড়িতে খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানানো হয়। কখনও মাটন কারি, কখনও মাটন বিরিয়ানি খাওয়ানোর কথা বলে তাঁদের ডেকে আনা হয়েছিল বলে অভিযোগ। পুলিশের সন্দেহ, খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হত। কেউ অচেতন হয়ে পড়লে শিলনোড়া দিয়ে মাথায় আঘাত করে খুন করা হত।
প্রতিবেশীদের কানে যাতে কোনও আওয়াজ না পৌঁছয়, সে জন্য হত্যাকাণ্ডের সময় টেলিভিশনের শব্দ বাড়িয়ে রাখা হত বলে তদন্তকারীদের দাবি। খুনের পর দেহগুলি প্লাস্টিকের একাধিক স্তরে মুড়ে বস্তায় ভরা হত। তার পর গভীর রাতে নিজের টয়োটা ইটিওস গাড়িতে চাপিয়ে বিভিন্ন নির্জন জায়গায় ফেলে আসতেন অভিযুক্ত। দেহ থেকে সোনার গয়না খুলে নেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। সেই গয়নার কিছু অংশ বিক্রি করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
দীর্ঘ ২০ বছরের দাম্পত্য অশান্তি? সম্পত্তির দিকও খতিয়ে দেখছে পুলিশ
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। জেরায় ইন্দুশেখর দাবি করেছেন, স্ত্রীর সঙ্গে প্রায় 20 বছর ধরে তাঁর বিবাদ চলছিল। স্ত্রীকে তাঁর বাপের বাড়ির আত্মীয়রা সব সময় সমর্থন করতেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। সেই ক্ষোভ থেকেই শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নিশানা করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
তবে শুধু দাম্পত্য কলহই নয়, প্রায় 3 কোটি টাকার সম্পত্তি নিয়ে বিবাদের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না পুলিশকর্তারা। মৃতদের আত্মীয়দের একাংশের অভিযোগ, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধও এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে থাকতে পারে। যদিও হত্যার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত হয়নি। অভিযুক্তের বক্তব্য এবং পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ—দু’দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাবার সঙ্গে মেয়ের যোগ? তদন্তে ১৭ বছরের কিশোরী
এই ঘটনায় অভিযুক্তের 17 বছরের মেয়ের ভূমিকাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্তকারীদের সন্দেহ, কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে এবং দেহ সরানোর কাজে বাবাকে সাহায্য করেছিল সে। আত্মীয়দের বাড়িতে ডেকে আনার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে। কর্নাটকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিয়াঙ্ক খাড়গে দাবি করেছেন, প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে, অভিযুক্ত নিজের মেয়েকে প্রভাবিত করে অপরাধে সহযোগী করে তুলেছিলেন। তবে ওই কিশোরীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
১০ বছরের শিশুও ছিল পরবর্তী নিশানায়?
তদন্তে আরও ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে। অভিযুক্তের গাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে 10 বছরের এক শিশুকে। সে মৃতদের পরিবারেরই সদস্য। পুলিশের দাবি, ওই শিশুটিকেও খুন করার পরিকল্পনা ছিল ইন্দুশেখরের। তার বাবা-মাকে খুন করার পর শিশুটিকে বলা হয়েছিল, তারা তীর্থযাত্রায় গিয়েছেন। কয়েক দিন ধরে অভিযুক্ত ও তার মেয়ের সঙ্গে ছিল সে। পুলিশের অনুমান, সুযোগ বুঝে তাকেও খুন করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তার আগেই অভিযুক্ত গ্রেফতার হওয়ায় প্রাণে বেঁচে যায় শিশুটি।
পুলিশের কাছে শিশুটি জানিয়েছে, গাড়িতে কয়েকটি বস্তা রাখা ছিল। সেগুলির মধ্যে দেহ ছিল বলে তার সন্দেহ। গাড়ি থেকে দুর্গন্ধও বেরোচ্ছিল। অভিযুক্ত বিভিন্ন নির্জন জায়গায় গিয়ে বস্তাগুলি ফেলে আসতেন বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছে সে। মৃতদের মোবাইল ফোনও অভিযুক্ত নিজের কাছে রেখেছিলেন বলে অভিযোগ। আত্মীয়দের কাছে ওই ফোনগুলি থেকে বার্তা পাঠিয়ে পরিবারের সদস্যরা বেড়াতে গিয়েছেন বলে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
নিখোঁজের অভিযোগ থেকেই সামনে এল হত্যাকাণ্ড
পরিবারের একাধিক সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। ফোন বন্ধ থাকায় সন্দেহ বাড়ে আত্মীয়দের। 3 নভেম্বর শ্রীপুরম থানায় নিখোঁজের অভিযোগ দায়ের করা হয়। তদন্তে নেমে পুলিশ ইন্দুশেখরকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তাঁর বক্তব্যে অসঙ্গতি ধরা পড়তেই সন্দেহ ঘনীভূত হয়। পরে বুধবার উলসুরগেটের কাছে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর গাড়ি বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বলে সন্দেহ করা শিলনোড়া।
এখনও পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া দেহগুলির মধ্যে রয়েছে 7 বছরের পুনীতের দেহ। সুনীতা ও তাঁর মা রূপাবতীর দেহও তামিলনাড়ুর সেলম জেলার একটি জঙ্গল এলাকা থেকে উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে দেহ ফেলে আসার অভিযোগ থাকায় তল্লাশিতে একাধিক দল গঠন করা হয়েছে। গাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া সুগন্ধির বোতলগুলিও পরীক্ষা করে দেখছেন তদন্তকারীরা।
দেহ সরানোর সময় সেগুলি ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একটি পারিবারিক বিবাদ কী ভাবে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে গড়াল, তা নিয়ে বেঙ্গালুরু জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য। অভিযুক্তের মেয়ের ভূমিকা, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ এবং হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ, সব দিক খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্ত এখনও চলছে। ফলে জেরায় অভিযুক্তের করা দাবি বা পুলিশের প্রাথমিক অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেওয়ার অবকাশ নেই।




