নয়াদিল্লি: ঐতিহাসিক ন্যাশনাল মিউজিয়ামের হরপ্পা গ্যালারি থেকে আচমকাই উধাও হয়ে গেছে সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো সিন্ধু সভ্যতার বিশ্ববিখ্যাত নিদর্শন 'ডান্সিং গার্ল' বা “নৃত্যরতা তরুণী” ব্রোঞ্জ মূর্তিটি। ইতিহাসের এই আকস্মিক অন্তর্ধান ঘিরে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে। মিউজিয়ামে আসা দর্শনার্থীরা এই অমূল্য সম্পদ দেখতে না পেয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। এই ঘটনার নেপথ্যে আসলে কী চলছে এবং কর্তৃপক্ষই বা কী বলছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন লোকসভার প্রাক্তন সাংসদ তথা ইতিহাস অনুরাগী আর সেন্থিল। তিনি সম্প্রতি সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা পরিদর্শনের পর এই ঐতিহাসিক মূর্তিটি দেখার উদ্দেশ্যে দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে যান। কিন্তু হরপ্পা গ্যালারিতে পৌঁছে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান; কারণ সেখানে মূর্তিটি প্রদর্শনের জন্য রাখা ছিল না। বিশ্বজুড়ে মোনালিসার মতো প্রাচীন ইতিহাসের যে গুরুত্ব, ভারতের কাছে এই ডান্সিং গার্লের গুরুত্বও ঠিক ততটাই। ফলে এমন একটি জাতীয় সম্পদকে গ্যালারি থেকে সরিয়ে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের কাছে লিখিত অভিযোগ জানান।
মিউজিয়াম সূত্রে জানা গেছে, মূর্তিটি চুরি বা হারিয়ে যায়নি, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের কারণেই সেটিকে সাধারণের প্রদর্শন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। হরপ্পা গ্যালারির যে নির্দিষ্ট তাকে মূর্তিটি রাখা থাকত, তার পাশে কর্তৃপক্ষ একটি ছোট সাদা চিরকুট সেঁটে দিয়েছে। সেখানে লেখা রয়েছে— 'Object removed for Yuge Yugeen Bharat Museum Mock Gallery' অর্থাৎ, নির্মাণাধীন 'যুগ যুগীন ভারত মিউজিয়াম'-এর মক গ্যালারির প্রদর্শনীর জন্য বস্তুটি সরানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন প্রস্তাবিত এই মেগা মিউজিয়াম প্রকল্পের প্রোটোটাইপ বা একটি খসড়া প্রদর্শনী তৈরির কাজ চলছে ন্যাশনাল মিউজিয়াম চত্বরেরই তিনটি গ্যালারিতে। আর সেই কারণেই শুধু ডান্সিং গার্ল নয়, পশুপতি সিলমোহর ও কুশান যুগের কুবের মূর্তি সহ একাধিক অমূল্য প্রাচীন নিদর্শন সাধারণের চোখের আড়ালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ইতিহাসবিদ এবং মিউজিয়াম বিশেষজ্ঞদের একাংশ কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সাবেক সাংসদ আর সেন্থিল সংস্কৃতি মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াতকে লেখা চিঠিতে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, কোনো বিকল্প সুরক্ষিত ও স্থায়ী গ্যালারি সম্পূর্ণ প্রস্তুত না করে এভাবে একটি প্রাচীন জাতীয় সম্পদকে তার মূল স্থান থেকে সরিয়ে রাখা আন্তর্জাতিক মিউজিয়াম কিউরেশন প্রোটোকলের পরিপন্থী। নতুন এই 'মক গ্যালারি' কবে নাগাদ সাধারণ জনগণের জন্য খোলা হবে বা আদৌ তা সাধারণ মানুষ দেখতে পাবেন কি না, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো স্পষ্ট ঘোষণা নেই। ফলে কতদিন এই ইতিহাসকে বন্দি থাকতে হবে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।
ন্যাশনাল মিউজিয়াম প্রশাসন এবং সংস্কৃতি মন্ত্রক বিষয়টি নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বা বিস্তারিত বিবৃতি দেয়নি। তবে মিউজিয়ামের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি সম্পূর্ণ একটি প্রশাসনিক ও স্থানান্তর প্রক্রিয়ার অংশ। নতুন ভারত মিউজিয়াম কমপ্লেক্সের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থেই এই অস্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।




