সরকার বদলেছে। বদলেছে প্রশাসনের মুখও। কিন্তু ক্ষমতার করিডরে কি সত্যিই বদলেছে রাজনীতির বহু পুরনো অভ্যাস? বাংলার রাজনীতিতে এই প্রশ্ন নতুন নয়। বরং প্রতিটি ক্ষমতার পালাবদলের পরই নতুন করে ফিরে আসে। এক সময় যে 'তোলাবাজি' এবং 'সিন্ডিকেট রাজ'-কে সামনে রেখেই তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল বিজেপি, আজ ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই সেই একই অভিযোগের আঁচ পৌঁছতে শুরু করেছে শাসকদলের অন্দরেও। আর সেই কারণেই কি একের পর এক মন্ত্রী ও শীর্ষ নেতার মুখে শোনা যাচ্ছে একই সতর্কবার্তা? রাজনৈতিক মহলে এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সেই প্রশ্নই।
সোমবার কলকাতা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল যে ভাষায় দলের নেতা-কর্মীদের সতর্ক করলেন, তা নিছক একটি রাজনৈতিক মন্তব্য বলে উড়িয়ে দিতে নারাজ পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, দলের কারও বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁকে রেয়াত করা হবে না। এমনকি প্রয়োজনে দল থেকেও বহিষ্কার করা হবে। অগ্নিমিত্রার কথায়, সবাইকে 'ডিটারজেন্ট আর ওয়াশিং মেশিনে ধুয়ে' দলে আনা হয়নি। ফলে কেউ ক্ষমতায় এসে যদি তোলাবাজিকে আয়ের রাস্তা বলে মনে করেন, তবে বিজেপিতে তাঁর জায়গা নেই।
অগ্নিমিত্রার এই মন্তব্য অবশ্য বিচ্ছিন্ন নয়। এর আগে একই ইস্যুতে সরব হয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, দলের নিচুতলায় কিছু ক্ষেত্রে বিচ্যুতি দেখা যাচ্ছে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। একই সুর শোনা গিয়েছে মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের মুখেও। কয়েক দিনের ব্যবধানে শাসকদলের প্রথম সারির তিন নেতার মুখে একই ধরনের সতর্কবার্তা শোনা যাওয়ায় রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিষয়টি এখন আর শুধুমাত্র প্রতীকী অবস্থান নয়; বরং সংগঠনের অন্দরে পৌঁছনো অভিযোগের প্রেক্ষিতেই নেতৃত্ব প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে চাইছে।
বাংলার রাজনৈতিক অভিধানে 'তোলাবাজি' শব্দটি বহু দিনের। বাড়ি নির্মাণ থেকে ব্যবসা, বাজার থেকে পরিবহণ— নানা ক্ষেত্রেই এই অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় স্তরের একাংশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ অতীতেও শোনা গিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেই বিরোধী থাকাকালীন বিজেপি 'তোলাবাজি'কে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু করে তুলেছিল। নির্বাচনী প্রচার থেকে বিধানসভা, সর্বত্রই শোনা গিয়েছিল সিন্ডিকেটমুক্ত বাংলার প্রতিশ্রুতি। ফলে ক্ষমতায় আসার পর একই ধরনের অভিযোগের ইঙ্গিত সামনে আসা স্বাভাবিকভাবেই শাসকদলের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের ধারাবাহিক মন্তব্যের মধ্যে কার্যত দু'টি রাজনৈতিক বার্তা লুকিয়ে রয়েছে। প্রথমত, বর্তমান সরকার আগের সরকারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলে ক্ষমতায় এসেছে, সেই একই অভিযোগকে কোনওভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না— অন্তত জনসমক্ষে সেই অবস্থান স্পষ্ট করতে চাইছে নেতৃত্ব। দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষ এবং দলের নিচুতলার কর্মীদের কাছেও একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে— কোথাও তোলাবাজি, সিন্ডিকেট বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে তা প্রকাশ্যে আনুন, নেতৃত্ব বা প্রশাসনকে জানান। অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে একদিকে যেমন প্রশাসনিক কড়াকড়ির ছবি তুলে ধরতে চাইছে সরকার, অন্যদিকে তেমনই দলের ভিতরেও শৃঙ্খলার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য, ইতিমধ্যেই তোলাবাজির অভিযোগে দলের কয়েক জনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন অগ্নিমিত্রা পাল। পাশাপাশি সিন্ডিকেট, চোলাই মদ কিংবা তোলাবাজির অভিযোগ জানানোর জন্য রাজ্য সরকারের চালু করা টোল-ফ্রি নম্বর ব্যবহারের আবেদনও করেছেন তিনি। অর্থাৎ শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যেই নয়, অভিযোগ জানানোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথের কথাও সামনে আনতে চাইছে সরকার।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কোনও সরকার বা রাজনৈতিক দলের প্রকৃত পরীক্ষা হয় শুধুমাত্র কঠোর বার্তায় নয়, সেই বার্তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তার উপর। বাংলার রাজনীতিতে 'তোলাবাজি'র বিরুদ্ধে অতীতেও বহুবার সরব হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। কিন্তু ক্ষমতার বাস্তবতা অনেক সময় সেই অবস্থানকে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। ফলে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের এই প্রকাশ্য সতর্কবার্তা ভবিষ্যতে কতটা প্রশাসনিক পদক্ষেপে রূপ নেয়, অভিযোগের মুখে দলীয় পরিচয়কে কতটা অগ্রাহ্য করা হয় এবং শাসকদলের নিচুতলায় সেই বার্তা কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের। কারণ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বাস্তবের পদক্ষেপই ঠিক করে দেয় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও আদৌ পরিবর্তন হয়েছে কি না।




