'কাটমানি' এবং 'সিন্ডিকেট'— রাজ্যে এই দুই শব্দ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। রাজ্যের বর্তমান শাসকদল বিজেপির অভিযোগ, সরকারি প্রকল্প থেকে বাড়ি তৈরি, ব্যবসা থেকে পণ্য পরিবহণ— আগের তৃণমূল সরকারের আমলে নানা ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে বেআইনি অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। পালাবদলের পর নতুন সরকারের দাবি, এমন অভিযোগ বরদাস্ত করা হবে না। সেই বার্তাকেই আরও জোরালো করতে এবার বড় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার চারটি পৃথক টোল-ফ্রি হেল্পলাইন চালুর ঘোষণা করেছে । এগুলি হল 155334 (কাটমানি সংক্রান্ত অভিযোগ), 155335 (সিন্ডিকেট অপরাধ), 155337 (বেআইনি রোড ট্যাক্স ও টোল) এবং 155339 (বেআইনি মদ) ৷ এই নম্বরগুলিতে বিনামূল্যে সাত দিনের যে কোনও সময় (২৪X৭) ফোন করে অভিযোগ জানানো যাবে ৷
সরকারি সূত্রের দাবি, অভিযোগ নথিভুক্ত হওয়ার পর তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও পুলিশের কাছে পাঠানো হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, অভিযোগকারী যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেই বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
নবান্ন সূত্রে খবর, শুধুমাত্র অভিযোগ গ্রহণ করাই নয়, গোটা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের ধরন, এলাকা এবং পুনরাবৃত্তির ভিত্তিতে তথ্য বিশ্লেষণ করে কোথায় কী ধরনের অপরাধ বেশি ঘটছে, তারও একটি ডেটাবেস তৈরি হবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ও প্রশাসনকে আরও সক্রিয়ভাবে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সড়কে ট্রাকচালকদের কাছ থেকে বেআইনি টোল আদায়ের অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় পড়ে যায়। তদন্তে নেমে পুলিশ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। কয়েক জন সরকারি আধিকারিকের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেই ঘটনার পরই গোটা রাজ্যে বেআইনি তোলাবাজি এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল সরকার। মঙ্গলবারের ঘোষণা সেই অবস্থানকেই আরও স্পষ্ট করল বলে মনে করছে প্রশাসনের একাংশ।
শুধু বেআইনি টোল নয়, সরকারি প্রকল্পে কাটমানি দাবি, নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহে জোরজবরদস্তি, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তোলা আদায় কিংবা অবৈধ মদের কারবার— সব ক্ষেত্রেই সরাসরি অভিযোগ জানানো যাবে এই হেল্পলাইনে। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনে পুলিশি তদন্ত, প্রশাসনিক অনুসন্ধান এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
তবে এই ঘোষণার রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। 'কাটমানি' এবং 'সিন্ডিকেট রাজ' ইস্যু বহু বছর ধরেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অন্যতম বিতর্কিত বিষয়। অতীতে বিজেপি বারবার এই অভিযোগ তুলে প্রাক্তন তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে সরকার নিজেই অভিযোগ জানানোর জন্য পৃথক টোল-ফ্রি ব্যবস্থা চালু করায় রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করারও চেষ্টা।
এখন অবশ্য নজর থাকবে অন্য দিকে। হেল্পলাইনে কত অভিযোগ জমা পড়ে, তার কতগুলি তদন্তের মুখ দেখে এবং কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়— তার উপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়। কারণ, সাধারণ মানুষের একাংশের মতে, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
ফলে চারটি টোল-ফ্রি নম্বর চালুর মধ্য দিয়ে রাজ্য সরকার দুর্নীতি, তোলাবাজি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নতুন লড়াইয়ের সূচনা করল ঠিকই, কিন্তু সেই লড়াই কতটা সফল হবে, তার উত্তর দেবে আগামী দিনের বাস্তব চিত্র।