ঢাকা, হাবিবুর রহমান: বাংলাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূল এলাকার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার করুণ উপাখ্যান নিয়ে নজর নেই যেন কারও। সবার দৃষ্টি শহর, বন্দর, উপজেলা সদরগুলোতে। উপকূলের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের তীব্র সংকট, লবণাক্ততার কারণে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে নাকাল গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। বছরের অধিকাংশ সময় নানা দুর্যোগে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে রাস্তাঘাট ও বেড়িবাঁধ ভেঙে অনেক এলাকা পানিবন্দি হয়ে পড়ে।
এতে দুর্গম এলাকার মানুষ জরুরি মুহূর্তে হাসপাতালে যেতে পারে না। ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যখাতের মানোন্নয়নে সরকার বিভিন্ন সময় বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ ও স্বাস্থ্যখাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তার সুফল পাচ্ছে না উপকূলবাসী। এছাড়া প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি (এসএসকে)-এর মতো প্রকল্প চালু করা হয়েছে, যাতে তারা হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ ও সেবা পান। কিন্তু কর্তৃপক্ষের লুটপাটের কারণে সেই হতদরিদ্র উপকূলবাসীর কপালে কিছুই জুটছে না।
বাংলাদেশের উপকূলবর্তী বেশিরভাগ জনপদে সরকারি হাসপাতাল কিংবা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো অনেক দূরে দূরে অবস্থিত। আবার এর মধ্যে অনেক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ কিংবা চিকিৎসক সংকটে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। কোনো কোনো জায়গায় চিকিৎসক থাকলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের এমন বেহাল অবস্থা থাকায় প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যগত কোনো সমস্যা দেখা দিলে উপকূলের মানুষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারে না। আর পার্শ্ববর্তী কিছু বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক থাকলেও সেখানে গিয়ে অতিরিক্ত খরচের কারণে তাদের পক্ষে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না।
স্বাস্থ্য মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। প্রতিটি মানুষের সুন্দর জীবনযাপনের পেছনে স্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এ জন্য কথায় বলে, স্বাস্থ্যই সম্পদ। কিন্তু আমাদের দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলের বেশিরভাগ মানুষ এই স্বাস্থ্যসেবা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রায় নানামুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিভিন্ন কারণে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় এ অঞ্চলে বসবাসরত মানুষের গড় আয়ু কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে উপকূলের নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
অপরদিকে উপকূলীয় অঞ্চলের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের বহু পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। অর্ধেকেরও বেশি পদ ফাঁকা থাকায় সাধারণ রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে উপজেলা স্বাস্থ্য সহকারী পদে নতুন নিয়োগ না হওয়ায় খুলনার গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জনবলের অর্ধেকেরও কম সংখ্যক কর্মী দিয়ে চলছে টিকাদান কর্মসূচি, মা ও শিশু স্বাস্থ্য পরিচর্যা এবং পুষ্টি বিষয়ক পরামর্শের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। এতে করে গ্রামের সাধারণ মানুষ তাদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খুলনার ৯টি উপজেলায় স্বাস্থ্য সহকারীর ৩৯০টি পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন প্রায় ২শ’ জন। সর্বশেষ ২০১০ সালে স্বাস্থ্য সহকারী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এরপর অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে দুইবার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মৃত্যু ও অবসরের কারণে জনবল সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। আর জনবল সংকটের কারণে একজন স্বাস্থ্য সহকারীকে একাধিক ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কর্তব্যরত স্বাস্থ্য সহকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাজবাত২৪ বাংলাকে জানান, এই ওয়ার্ডে জনসংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। এজন্য একে ‘এ’ ও ‘বি’ দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আমি ‘বি’ গ্রুপে। এখানে ৪০ হাজার মানুষের বিপরীতে মাত্র ২ জন কাজ করি। প্রতিদিন প্রায় দেড়শ বাচ্চাকে টিকা দিতে হয়। এত মানুষের বাসায় যাওয়া তো দূরের কথা, একদিনে একটি লাইনও শেষ করা যায় না। তারপরও আমাদের অস্বাস্থ্যকর জায়গায় বসে টিকা দিতে হয়, যা শিশু, অভিভাবক ও আমাদের সবার জন্যই কষ্টকর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ জায়গায় তা দেখা যায় না। এ ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিটি ইউনিয়নের ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে জর্জরিত। বিশেষ করে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রের প্রতিটিতে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসাররা (এসএসিএমও) নানা সমস্যা দেখিয়ে উপকূলীয় প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বদলি হওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে উপকূলীয় এসব স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রগুলো চিকিৎসক সংকট থেকে সহজে বেরিয়ে আসতে পারে না।
এ ছাড়া বছরের বেশিরভাগ সময় লবণ-পানিতে ডুবে থাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো দিনে দিনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নতুন করে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র তৈরি করা বা সংস্কারেও তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। চিকিৎসাসেবায় ব্যবহারের জন্য এসব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে দেওয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতিও অল্পদিনে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে যে পরিমাণ ওষুধ সরবরাহের কথা রয়েছে, তার চার ভাগের একভাগেরও কম পাচ্ছেন স্থানীয় রোগীরা। ফলে বিভিন্ন সংকটে উপকূলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হচ্ছে না।