করোনা কি আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসছে? গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নতুন করে কোভিড সংক্রমণের খবর সামনে আসায় সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। বিহারের ভাগলপুরে এক ৬৫ বছরের বৃদ্ধের শরীরে কোভিড-১৯ সংক্রমণ ধরা পড়ার পর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার আগেই কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ১০ বছরের এক বালক। পাশাপাশি মহারাষ্ট্র ও অন্ধ্রপ্রদেশেও নতুন সংক্রমণের খবর মিলেছে। যদিও চিকিৎসকদের একাংশের বক্তব্য, পরিস্থিতির উপর নজর রাখা জরুরি হলেও এখনই বড়সড় ঢেউয়ের আশঙ্কা করার কারণ নেই।
ভাগলপুরে ৬৫ বছরের বৃদ্ধ আক্রান্ত
বিহার স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, ভাগলপুরের তিলকামাঞ্জি থানার হাটিয়া রোড এলাকার বাসিন্দা ওই বৃদ্ধ কয়েক দিন ধরে জ্বর ও শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। প্রথমে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা শুরু হলেও উপসর্গ না কমায় চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁর আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করা হয়।
পরিবারের দাবি, ১৬ জুলাই নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। ১৮ জুলাই হাতে আসে রিপোর্ট। তাতেই কোভিড সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। রিপোর্ট পাওয়ার পরই স্বাস্থ্য দফতরকে জানানো হয় এবং আক্রান্তের পরিবারের সদস্যদেরও নজরদারিতে রাখা হয়। প্রয়োজন হলে তাঁদেরও করোনা পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর।
সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওই বৃদ্ধকে ভাগলপুরের জওহরলাল নেহরু মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (মায়াগঞ্জ হাসপাতাল)-এ ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. রাজকমল চৌধুরী জানিয়েছেন, রোগীর শরীরে আপাতত অক্সিজেনের কোনও সমস্যা নেই এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। সরকারি ব্যবস্থাতেও নমুনা পরীক্ষা করা হবে। তাঁর কথায়, “আতঙ্কের কোনও কারণ নেই। রোগীকে পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা চলছে।”
কলকাতায় করোনা আক্রান্ত ১০ বছরের বালক, আইসিইউ-তে চিকিৎসা
এর আগে শনিবার কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালে জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি করা হয় গড়িয়ার বাসিন্দা ১০ বছরের এক বালককে। চিকিৎসকদের সন্দেহ হওয়ায় তাঁর সোয়াব পরীক্ষা করা হলে রিপোর্টে কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপরই তাকে আইসোলেশনে রাখা হয়। হাসপাতাল সূত্রে খবর, শিশুটি এখনও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন এবং তার শারীরিক অবস্থা পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সহেলি দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, এক্স-রেতে শিশুটির ডান ফুসফুসে নিউমোনিয়ার লক্ষণ ধরা পড়েছে। ভাইরাল পরীক্ষায় সার্স-কোভ-২ সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। যেহেতু এটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, তাই অ্যান্টিবায়োটিক নয়, সহায়ক চিকিৎসা, নেবুলাইজেশন এবং আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা চলছে। শিশুটির মাকেও আইসোলেশনে রাখা হয়েছে এবং তাঁরও কোভিড পরীক্ষা করা হতে পারে।
তবে চিকিৎসকের স্পষ্ট বার্তা, “বর্তমানে শিশুদের মধ্যে সর্দি-কাশি-জ্বরের প্রবণতা রয়েছে। তাই কোভিড নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।”
মহারাষ্ট্র ও অন্ধ্রপ্রদেশেও নতুন সংক্রমণ
শুধু বিহার বা পশ্চিমবঙ্গ নয়, দেশের আরও কয়েকটি রাজ্যেও নতুন করে কোভিড সংক্রমণের খবর মিলছে। মহারাষ্ট্রের পুনেতে প্রায় তিন বছর পর আবার নতুন সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। গত ১০ দিনে একাধিক নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশের উপসর্গ মৃদু হলেও বয়স্ক এবং শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে অন্ধ্রপ্রদেশে ২৬ জুন থেকে ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে ১২ জন নতুন আক্রান্ত এবং চার জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। আক্রান্তরা বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকায় তাঁদের নমুনা পুনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজিতে পাঠানো হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের সন্দেহ, ওমিক্রনের নতুন উপ-ভ্যারিয়েন্ট 'সিকাডা' (Cicada) সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সরকারি নিশ্চিতকরণ হয়নি।
বর্ষায় শুধু কোভিড নয়, বাড়ছে অন্যান্য ভাইরাল সংক্রমণও
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালে শুধু কোভিড নয়, ইনফ্লুয়েঞ্জা-এ, এইচ১এন১-সহ একাধিক শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাসের সংক্রমণও বাড়ে। ফলে জ্বর, গলা ব্যথা, কাশি, শ্বাসকষ্ট বা দীর্ঘদিন উপসর্গ থাকলে তা হালকাভাবে না নিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য দফতরের বার্তা— আতঙ্ক নয়, সতর্কতাই ভরসা
স্বাস্থ্যকর্তাদের বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংক্রমণের উপসর্গ মৃদু এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না। তবে প্রবীণ, শিশু, গর্ভবতী মহিলা এবং যাঁদের দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা রয়েছে, তাঁদের বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহার, হাত পরিষ্কার রাখা, ভিড় এড়ানো এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো— এই কয়েকটি অভ্যাসই এখনও কোভিড প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নতুন সংক্রমণের খবর মিললেও, পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এখনই আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।